ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ: মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রত্যাহার

রাজধানীর মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গোলাম আজমকে তাঁর পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। একজন নারী উদ্যোক্তার কাছ থেকে বাজার বা মার্কেটের দখল পুনরুদ্ধার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের লিখিত অভিযোগ ওঠার পর এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলো। শুক্রবার (১ মে, ২০২৬) ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের (ভারপ্রাপ্ত) পক্ষ থেকে এই আদেশ জারি করা হয়।


প্রশাসনিক আদেশ ও বর্তমান অবস্থান

ডিএমপি কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজমকে মিরপুর মডেল থানা থেকে সরিয়ে ডিএমপি সদর দপ্তরের প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়েছে। ডিএমপির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মোস্তাক সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

শনিবার (২ মে) রাতে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া তথ্যে তিনি জানান, প্রশাসনিক কারণে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে মোহাম্মদ গোলাম আজমকে প্রত্যাহারের পর বর্তমানে মিরপুর মডেল থানায় স্থায়ীভাবে কাউকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রদান করা হয়নি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শীঘ্রই শূন্য পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হবে।


ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রেক্ষাপট

গত ২৬ এপ্রিল সামসাদ আরা সাথী নামের এক ভুক্তভোগী নারী ডিএমপি কমিশনারের কাছে মোহাম্মদ গোলাম আজমের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ পেশ করেন। অভিযোগের মূল বিষয় ছিল একটি মার্কেটের দখল উদ্ধার সংক্রান্ত বিরোধ।

সামসাদ আরা সাথীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর মালিকানাধীন একটি মার্কেটের অবৈধ দখল উচ্ছেদে সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ওসি মোহাম্মদ গোলাম আজম তাঁর কাছে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। পরবর্তীতে থানার দুজন উপপরিদর্শককে (এসআই) মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে দুই দফায় মোট পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন ওই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।

লিখিত অভিযোগে ভুক্তভোগী উল্লেখ করেন, নগদ অর্থ প্রদানের পরও ওসি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করেননি। বরং অর্থের বিনিময়ে পুলিশি সহায়তা না পেয়ে তিনি উল্টো দখলদারদের হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। সামসাদ আরার অভিযোগ, পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার পরও গোলাম আজম বিভিন্ন সময়ে আরও অর্থ দাবি করে আসছিলেন, যা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হন।


অভিযোগকারীর প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত প্রক্রিয়া

শনিবার রাতে এই প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের খবর পাওয়ার পর সামসাদ আরা সাথী গণমাধ্যমকে জানান, ওসির প্রত্যাহারের বিষয়টি তিনি লোকমুখে শুনেছেন। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে অভিযোগের বর্তমান অবস্থা বা গৃহীত ব্যবস্থার বিষয়ে এখনো কিছু অবহিত করা হয়নি।

ঘুষের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই এই প্রত্যাহার কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মো. মোস্তাক সরকার সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, পুলিশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কারণে বদলি বা প্রত্যাহার একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া। তবে ওই নারীর অভিযোগের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে প্রত্যাহারের সাথে ঘুষের অভিযোগের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। পুলিশের বিধি অনুযায়ী, তদন্ত কমিটি অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে পরবর্তী সুপারিশ প্রদান করবে।


জননিরাপত্তা ও পুলিশি জবাবদিহিতা

রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা হিসেবে মিরপুর মডেল থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ এবং পরবর্তী প্রত্যাহার স্থানীয় মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য যে, ডিএমপি কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হলো।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। তদন্ত চলাকালে নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থেই অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়। মিরপুর মডেল থানার এই ঘটনাটি বর্তমানে পুলিশের ডিসিপ্লিনারি সেকশনের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

বর্তমানে মিরপুর মডেল থানার কার্যক্রম পুলিশের অন্য কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে চলমান রয়েছে। সাধারণ নাগরিক ও সেবাগ্রহীতারা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি সাপেক্ষে এই