ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে গৃহকর্মী হিসেবে রেখে নির্যাতনের অভিযোগে এক চিকিৎসক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এবং শিশু সুরক্ষা ও গৃহকর্মী ব্যবস্থার ওপর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা শহরের উত্তর মৌড়াইল এলাকার একটি বাসা থেকে কে এম আবদুল্লাহ আল নোমান এবং তার স্ত্রী কিমিয়া সাদাত তোফাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দুজনই একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গ্রেপ্তারের পর তাদের আদালতে হাজির করা হলে জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
পারিবারিক তথ্য অনুযায়ী, সরাইল উপজেলার পাকশিমুল গ্রামের ওই শিশুকে প্রায় নয় মাস আগে তার নানা ওই চিকিৎসক দম্পতির বাসায় নিয়ে যান। পরিবারের দাবি, সেখানে শিশুটিকে মূলত গৃহস্থালির কাজে নিয়োজিত রাখা হতো। শুরুতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও গত তিন মাস ধরে শিশুটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, পরে চিকিৎসক দম্পতির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে শিশুটি নাকি চুরি করে পালিয়ে গেছে। তবে এই তথ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে পরিবার খোঁজাখুঁজি শুরু করে। কোনো সন্ধান না পেয়ে গত ২৬ এপ্রিল সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন শিশুটির বাবা।
পুলিশ পরে অভিযান চালিয়ে চিকিৎসক দম্পতির বাসার পাশের একটি এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে। উদ্ধারকালে শিশুটি গুরুতর আহত অবস্থায় ছিল। তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত, ফোলা এবং পুরোনো ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি অভিযোগ করে জানায়, সামান্য ভুল হলেই তাকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হতো। এমনকি গরম তেল ছিটিয়ে দেওয়ার মতো নির্যাতনের ঘটনাও ঘটেছে বলে সে দাবি করে। শিশুটির বক্তব্য চিকিৎসকদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগীর বাবা বলেন, “আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করা হয়েছে। পরে তাকে চুরির অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
অন্যদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসক কে এম আবদুল্লাহ আল নোমান অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, শিশুটি তাদের গৃহকর্মী ছিল না, বরং তাদের সন্তানদের সঙ্গে খেলার জন্য বাসায় ছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটি বাসা থেকে টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যায়।
তবে সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, শিশুর বিরুদ্ধে কোনো চুরির অভিযোগ থানায় দায়ের হয়নি। বরং শিশুর পরিবারের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
আদালত সূত্র জানায়, মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পুলিশ মেডিকেল প্রতিবেদন সংগ্রহ করছে এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ঘটনার স্থান | উত্তর মৌড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া |
| ভুক্তভোগী | ১১ বছর বয়সী শিশু |
| অভিযুক্ত | কে এম আবদুল্লাহ আল নোমান, কিমিয়া সাদাত তোফা |
| পেশা | চিকিৎসক |
| অভিযোগ | শিশু নির্যাতন |
| গ্রেপ্তারের সময় | ৩০ এপ্রিল |
| বর্তমান অবস্থা | অভিযুক্ত কারাগারে, শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন |
বাংলাদেশে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে তদারকির অভাব, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির কারণে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে। তারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
