নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া দুটি পৃথক হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার ও বিচারপতি শেখ আবু তাহেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত মামলার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ব্যাখ্যা জানতে রুল জারি করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আইভীর পক্ষ থেকে পৃথক দুটি জামিন আবেদন করা হয়েছিল। দীর্ঘ শুনানির পর আদালত উভয় আবেদন বিবেচনা করে তাকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন প্রদান করেন। শুনানিতে তার পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন ও মোতাহার হোসেন সাজু অংশ নেন। সহযোগিতা করেন আইনজীবী এস এম হৃদয় রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দা সাজিয়া শারমিন।
মামলার নথি অনুযায়ী, সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয় যথাক্রমে দুই হাজার চব্বিশ সালের এগারো সেপ্টেম্বর এবং দুই হাজার পঁচিশ সালের ত্রিশ জুন। পরবর্তীতে প্রথম মামলায় চলতি বছরের দুই মার্চ এবং দ্বিতীয় মামলায় বারো এপ্রিল তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অধস্তন আদালতে জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর তিনি হাইকোর্টে পৃথকভাবে জামিনের জন্য আবেদন করেন।
এর আগে গত বছরের নয় মে ভোরে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত তিনটি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে যুক্ত করা হয়। ওই মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচটিতে গত বছরের নয় নভেম্বর হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলেও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করলে সেই জামিন স্থগিত হয়ে যায়।
পরবর্তীতে আরও কয়েকটি মামলায়, যেগুলোর এজাহারে তার নাম সরাসরি উল্লেখ ছিল না, তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং সেখানেও তিনি জামিন পান। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের কারণে এসব জামিনও কার্যকর হয়নি এবং বর্তমানে বিষয়গুলো আপিল বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে।
আইভীর মামলার সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিচে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—
| তারিখ | ঘটনা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|
| ২০২৪ সালের ৯ মে | নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার | একাধিক হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলা যুক্ত |
| ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর | হাইকোর্ট থেকে প্রথম দফা জামিন | আপিল বিভাগে স্থগিত |
| ২০২৫ সালের ২ মার্চ | এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো | বিচারাধীন |
| ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল | আরেক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো | বিচারাধীন |
| ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি | আরও পাঁচ মামলায় জামিন | আপিলে স্থগিত |
| ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল | দুটি মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিন | রুল জারি |
আইভীর আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাকে নতুন করে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। তাদের মতে, কিছু মামলার এজাহারে তার নাম না থাকলেও তাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আইনের পরিপন্থী। এ বিষয়ে হাইকোর্টে দাখিল করা রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানিতে আদালত রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, এই গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী ঘোষণা করা হবে না।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেলিনা হায়াৎ আইভী দুই হাজার তিন থেকে দুই হাজার এগারো সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠনের পর তিনি টানা তিনবার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বর্তমানে তিনি একাধিক মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন এবং উচ্চ আদালতে ধারাবাহিকভাবে তার জামিন ও গ্রেপ্তার সংক্রান্ত আইনি বৈধতা নিয়ে শুনানি চলমান রয়েছে।
