রাজধানীর জুরাইন এলাকায় শারমিন আক্তার শেলী (২৬) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তদন্তে প্রতিনিয়ত নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে, যা পুরো ঘটনাকে আরও জটিল ও রহস্যময় করে তুলছে। বিশেষ করে হত্যার পর নিহতের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান করা হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়ায় তদন্তে বড় ধরনের মোড় এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত রোববার দুপুরে, যখন কদমতলী থানার জুরাইন কমিশনার মোড় এলাকার একটি বহুতল ভবনের চতুর্থ তলার একটি ফ্ল্যাট থেকে শেলীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে এবং পরে পুলিশকে জানানো হয়। ঘটনার পর নিহতের মা সাহানা বেগম কদমতলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় শেলীর কথিত স্বামী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে প্রধান আসামি করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামুন নিজেকে শেলীর স্বামী পরিচয় দিয়ে প্রায় আট থেকে নয় মাস আগে ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন। নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি ঘটনার দিন রাতে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন এবং পরদিন সকালে বের হয়ে যান। এরপর ফ্ল্যাটটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল।
২৩ এপ্রিল ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে অন্যান্য ভাড়াটিয়ারা বাড়িওয়ালাকে জানান। তখন বাড়িওয়ালা শেলীর মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠালে সেখান থেকে উত্তর আসে যে তিনি বাইরে আছেন এবং ফিরে এসে বিষয়টি দেখবেন। তবে তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই উত্তর শেলী দেননি; বরং তার মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অন্য কেউ ওই বার্তা পাঠিয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, শেলীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদানের একটি অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, যা হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়েই সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফোনটির সর্বশেষ অবস্থান ছিল একটি আবাসিক এলাকার আশেপাশে, যেখানে মামুনের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা নিচে উপস্থাপন করা হলো—
| তারিখ | ঘটনার বিবরণ |
|---|---|
| ২১ এপ্রিল | মামুন ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন |
| ২২–২৬ এপ্রিল | শেলীকে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে ধারণা |
| ২৩ এপ্রিল | ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় |
| ২৪–২৫ এপ্রিল | মোবাইল ফোন ব্যবহার করে বার্তা আদান-প্রদান |
| ২৭ এপ্রিল | মরদেহ উদ্ধার ও মামলা দায়ের |
পুলিশের ধারণা, মামুন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড আড়াল করার চেষ্টা করেছেন। এমনকি লাশ গোপন করার উদ্দেশ্যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের বিষয়েও সন্দেহ রয়েছে।
ওয়ারী বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মামুনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হলে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের একটি সূত্র, নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, মামুন পূর্বে সেনাবাহিনীতে মেজর পদে কর্মরত ছিলেন, পরে চাকরিচ্যুত হন। ব্যক্তিগত জীবনে একাধিকবার বিবাহবিচ্ছেদের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। অন্যদিকে শেলীরও পূর্বে বিবাহ হয়েছিল এবং তার একটি সন্তান রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে তাদের পরিচয়ের পর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
নিহতের মা অভিযোগ করেছেন, শেলী দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন এবং বিয়ের চাপ দিলে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। কয়েকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পরই তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রতারণা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার একত্রে জড়িত। তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং ঘটনার পূর্ণ রহস্য উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে।
