সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার পূর্বাভাস এবং টানা বৃষ্টি কৃষকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। আকাশের অবস্থা দেখে প্রতিনিয়ত উদ্বেগে থাকছেন কৃষকেরা, কারণ ধান কাটা ও মাড়াই—দুটিই এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জমিতে থাকা ফসল একদিকে পাকলেও, অন্যদিকে যেকোনো সময় বন্যায় তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জের পাগনার হাওরপারের লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) জানান, তাঁর ১০ বিঘা জমির মধ্যে মাত্র এক বিঘার ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বাকি ধান এখনো মাঠে রয়েছে। তিনি বলেন, পানির কারণে মেশিন চালানো যাচ্ছে না এবং শ্রমিক সংকটও রয়েছে। আবার রোদ না থাকায় কাটা ধান শুকানো ও মাড়াই করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তিনি এক ধরনের দ্বিমুখী ঝুঁকিতে পড়েছেন।
সদর উপজেলার দেখার হাওরপারের আস্তমা গ্রামের কৃষক আল আমিন (৩১) চার বিঘা জমির ধান আগেভাগেই কেটে ফেলেছেন। বন্যার আশঙ্কায় আধাপাকা ধানও কেটে নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, পানি উঠলে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাই আগেই ধান কেটে নেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুযায়ী সুনামগঞ্জে টানা বৃষ্টি হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টিপাত আরও বাড়তে পারে। উজানের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢল নামার আশঙ্কা রয়েছে, যা হাওরাঞ্চলে দ্রুত পানি বৃদ্ধি ঘটাতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার (প্রথম আলো) জানিয়েছেন, বৃষ্টি বাড়ার পাশাপাশি উজানের ঢল এলে অনেক ফসল রক্ষা বাঁধ চাপ সহ্য করতে পারবে না। বাঁধগুলোর মাটি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে গেছে।
জেলার কৃষি তথ্য অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলে মোট বোরো ধান চাষের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো মাঠে রয়েছে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় কিছু জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে।
হাওরের ধান পরিস্থিতি (সর্বশেষ তথ্য)
| বিষয় | পরিমাণ |
|---|---|
| মোট আবাদকৃত জমি | ২,২৩,৫১১ হেক্টর |
| এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে | ৭৮,২২৮ হেক্টর |
| এখনো অবশিষ্ট | ১,৪৫,২৮২ হেক্টর |
| ক্ষতিগ্রস্ত জমি | ৫,০৫০ হেক্টর |
| সম্ভাব্য উৎপাদন | প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন |
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক (প্রথম আলো) বলেন, বর্তমান আবহাওয়ায় জমিতে ফসল থাকা মানেই ঝুঁকি। ধান কাটা, মাড়াই এবং শুকানো—সব ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কৃষকদের দ্রুত ফসল কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পর্যায়ে চালের উৎপাদন উদ্বৃত্ত হলেও স্থানীয় কৃষকরা এখন ফসল রক্ষার চরম চাপের মধ্যে আছেন। অতীতে ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় ব্যাপক ফসলহানির কারণে খাদ্য সংকটও তৈরি হয়েছিল, যার প্রভাব দীর্ঘ সময় স্থায়ী ছিল।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় (প্রথম আলো) বলেন, হাওরের কৃষকেরা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দিনগুলোতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।