সংশোধিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬ কার্যকর হলে দেশের ব্যাংকিং খাতে পুনরায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিশেষ করে আইনের ১৮(ক) ধারার প্রয়োগের কারণে অতীতে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা আবারও ব্যাংকের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসার সুযোগ পেতে পারেন।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এ বিষয়ে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ‘সংশোধিত ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬: আবারও ঝুঁকিতে ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে ভয়েস ফর রিফর্ম। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি এবং নতুন আইনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীরা মতামত দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের মূল সংকট নতুন আইন নয়, বরং বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নে ঘাটতি। তার মতে, নতুন আইনটি যদি যথাযথভাবে প্রয়োগ না করা হয়, তবে এটি অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে তাদের জন্য ‘বেইল আউট’ সুবিধা তৈরি করতে পারে, যা ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলার জন্য নেতিবাচক হতে পারে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আমানতকারীদের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনগত বাধ্যবাধকতাও। তার মতে, শুধু আমানত বিমার সীমা অনুযায়ী দুই লাখ টাকা প্রদান করে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে সম্পূর্ণ আমানত সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তৌফিক আহমদ চৌধুরী আরও বলেন, দেশে ব্যাংক খাতের জন্য এখনো একটি কার্যকর এক্সিট পলিসি গড়ে ওঠেনি। ফলে কোনো ব্যাংক দুর্বল বা লোকসানজনক অবস্থায় গেলেও তা বন্ধ না করে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় টিকিয়ে রাখার প্রবণতা দেখা যায়। এতে শেষ পর্যন্ত আর্থিক বোঝা সাধারণ জনগণের ওপরই পড়ে। তিনি খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে বলেন, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপিদের আলাদা করে দেখা জরুরি এবং সে অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ার কারণে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অধ্যাপক ড. মুশতাক খান বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে কোনো ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া হলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার মতে, এক ব্যাংকের সংকট অন্য ব্যাংকেও ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ব্যাংক খাতে লুটপাটের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে ভবিষ্যতে ‘ব্যাংক রান’-এর মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন সওকত হোসেন বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ, বন্ধ করা বা পুনর্গঠনের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একত্রিত করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া কঠিন, বিশেষ করে যখন ঋণ পাচার ও অনিয়মের সমস্যা বিদ্যমান থাকে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হলে অনেক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হতো। তিনি আইনের প্রয়োগকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
গোলটেবিল বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ফাহিম মাসরুর। আলোচনায় আরও অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, রাজনীতিবিদ সারোয়ার তুষার, সিএফএ সোসাইটির সভাপতি আসিফ খান, ব্যবসায়ী শামস মাহমুদসহ বিভিন্ন খাতের বিশিষ্টজনরা।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা সামগ্রিকভাবে মত দেন যে, ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কেবল আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বরং সেই আইনগুলোর কঠোর, স্বচ্ছ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
