দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সোনার উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও বিয়েশাদির ঐতিহ্যবাহী গয়না কেনার ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশে এখন সোনার গয়নার পরিবর্তে কম দামের বিকল্প গয়নার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের শ্রীনগরের উজমা বশির নামের ২৯ বছর বয়সী এক হিসাবরক্ষক আসন্ন বিয়েকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে সোনার বাজারের দিকে নজর রাখছেন। তাঁর মাসিক আয় সীমিত হওয়ায় তিনি পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ না বাড়িয়ে নিজের উপার্জন থেকেই বিয়ের গয়না কেনার চেষ্টা করছেন। তিনি জানান, সমাজে নারীর সামাজিক মর্যাদা অনেক ক্ষেত্রে তার পরিধেয় সোনার পরিমাণের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে বিয়ের সময় কনেকে সোনা দেওয়ার রীতি দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা। এটি পারিবারিক মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক নির্যাতন ও চাপের বিরুদ্ধে আর্থিক সহায়তার একটি মাধ্যম হিসেবেও দেখা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে বিশ্ববাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে জানুয়ারির শেষ দিকে প্রতি আউন্স সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার পাঁচশত পঁচানব্বই মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। পরবর্তীতে তা কমে প্রায় চার হাজার আটশত একষট্টি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে।
ভারতে অক্ষয় তৃতীয়া উৎসবের সময় সোনার চাহিদা সাধারণত বেড়ে যায়। তবে চলতি সময়ে সেখানে দশ গ্রাম সোনার মূল্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় তেষট্টি শতাংশ বেড়ে এক হাজার ছয়শত সত্তর মার্কিন ডলারের সমপরিমাণে পৌঁছায়। এতে দেশটিতে সোনার গয়নার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজার পঁচিশ সালে ভারতে সোনার গয়নার চাহিদা আগের বছরের তুলনায় প্রায় চব্বিশ শতাংশ কমেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সোনার বাজার পরিস্থিতি
| দেশ | সোনার মূল্য পরিস্থিতি | চাহিদার পরিবর্তন | বাজার প্রবণতা |
|---|---|---|---|
| ভারত | দশ গ্রাম সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি | প্রায় চব্বিশ শতাংশ হ্রাস | কম দামের বিকল্প গয়নার ব্যবহার বৃদ্ধি |
| বাংলাদেশ | এক ভরি সোনার দাম প্রায় দুই হাজার চৌত্রিশ মার্কিন ডলার | চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে | নকল ও প্রলেপযুক্ত গয়নার দিকে ঝোঁক |
| পাকিস্তান | এক ভরি সোনার দাম প্রায় এক হাজার নয়শ আটত্রিশ মার্কিন ডলার | প্রায় অর্ধেক বিক্রি কমেছে | কম ক্যারেট ও বিকল্প গয়নার ব্যবহার বৃদ্ধি |
বাংলাদেশে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে এক ভরি সোনার দাম দুই হাজার ডলারের বেশি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য তা ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে ঢাকা ও অন্যান্য শহরের বাজারগুলোতে নকল ও প্রলেপযুক্ত গয়নার চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে কম দামের গয়না এখন ক্রেতাদের প্রধান পছন্দে পরিণত হচ্ছে।
পাকিস্তানে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে সোনার গয়নার বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেখানে অনেক ক্রেতা এখন কম মানের সোনা বা সম্পূর্ণ নকল গয়নার দিকে ঝুঁকছেন। উচ্চ দামের কারণে আসল সোনার গয়না ক্রমেই সীমিত আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিভিন্ন বাজারে দেখা যাচ্ছে, এক গ্রাম সোনা বা সোনার প্রলেপযুক্ত গয়না এখন ক্রেতাদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে। এই ধরনের গয়না দেখতে আসলের মতো হলেও তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা হওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে এর ব্যবহার বাড়ছে।
শ্রীনগরের এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বর্তমানে অনেক ক্রেতা সোনাকে দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্য গয়নার পরিবর্তে মূলত দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয় ও মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করছেন। সোনার উচ্চমূল্যের কারণে এর ব্যবহারিক চাহিদা কমে গিয়ে আর্থিক সম্পদ হিসেবে গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে।
