বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ ঝুঁকিতে বীমা ব্যবস্থা চাপে

জেনেভা অ্যাসোসিয়েশন নামক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বীমা কর্মসূচিগুলো ক্রমবর্ধমান দুর্যোগজনিত চাপের কারণে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যমান বীমা কাঠামোর ওপর আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপ দ্রুত বাড়ছে।

প্রতিবেদনটিতে মোট ১৪টি সরকারি-বেসরকারি যৌথ বীমা কর্মসূচি বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, এসব উদ্যোগ অনেক দেশে বীমা বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের জন্য বীমা সুবিধা সম্প্রসারণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। তবে একই সঙ্গে এগুলোর সামনে নতুন ধরনের ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বন্যা, বন অগ্নিকাণ্ড, সাইবার হামলা, মহামারি এবং অন্যান্য বিপর্যয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে যেসব ক্ষতি বীমার আওতায় নেই, সেগুলোর পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অনেক দেশের সরকারি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ আর্থিক দায়, বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতার ঝুঁকি এবং সাধারণ বীমাগ্রহীতাদের ঝুঁকি কমানোর পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব।

জেনেভা অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, কার্যকর সরকারি-বেসরকারি বীমা কর্মসূচিকে চারটি মৌলিক লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হবে। এগুলো হলো—সাশ্রয়ী মূল্যে বীমা সেবা নিশ্চিত করা, সরকারি অর্থের সুরক্ষা বজায় রাখা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং দ্রুত ও কার্যকরভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাড এরিস উল্লেখ করেন, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হওয়া উচিত নয়। বরং দুর্যোগ প্রতিরোধ, ঝুঁকি হ্রাস এবং সমাজের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, ঝুঁকি কমানোর জন্য কার্যকর উৎসাহ ব্যবস্থা তৈরি করা এবং পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দ্রুত করা জরুরি, যাতে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ কমে।

একই সংস্থার জননীতি ও নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক হেলেন শেরেনবার্গ বলেন, নীতিনির্ধারকদের একটি সুসংগঠিত কাঠামো অনুসরণ করা উচিত। এর মধ্যে রয়েছে সুরক্ষা ঘাটতি নিরূপণ, ঝুঁকি হ্রাসমূলক পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বীমা বাজারের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে কোন পরিমাণ ঝুঁকি গ্রহণ করা হবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জেনেভা অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬টি দেশে বিস্তৃত এবং প্রায় ২১ ট্রিলিয়ন অর্থমূল্যের সম্পদ পরিচালনা করে। তারা বিশ্বব্যাপী প্রায় ২৬০ কোটি মানুষের জন্য বীমা সুরক্ষা প্রদান করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে বীমা কাঠামোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বীমা সেবা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

নিচে প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলো সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্যপ্রভাব
পর্যালোচিত কর্মসূচি১৪টি সরকারি-বেসরকারি বীমা কর্মসূচিবিভিন্ন দেশে বীমা বাজারে স্থিতিশীলতা
দুর্যোগের ধরনবন্যা, বন অগ্নিকাণ্ড, সাইবার হামলা, মহামারিক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি
আর্থিক চাপউচ্চ দায়বদ্ধতা ও ক্ষতির বৃদ্ধিসরকারি অর্থনীতিতে চাপ
বাজার কাঠামোবেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বিদ্যমানপ্রতিযোগিতাগত ভারসাম্য সমস্যা
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাপ্রণোদনার ঘাটতি ও সুরক্ষা ঘাটতিদীর্ঘমেয়াদে টেকসইতা ঝুঁকির মুখে
নীতি নির্দেশনাঝুঁকি হ্রাস ও কাঠামোগত পরিকল্পনাকার্যকর বীমা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা

এই পর্যালোচনা অনুযায়ী, বৈশ্বিক দুর্যোগ ঝুঁকি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বীমা ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার এবং ঝুঁকি হ্রাসকে কেন্দ্রীয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।