রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে নতুন স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত

চলতি বছরের এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে দেশে এসেছে মোট ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধুমাত্র ১৫ এপ্রিল একদিনেই দেশে এসেছে ১৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। মাসের শুরু থেকেই ধারাবাহিকভাবে এই প্রবাহ ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ থেকে ১৫ এপ্রিল সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ১৪৭ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার। সেই তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে প্রবাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক সংকেত। তাদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, আমদানি ব্যয় মেটানো এবং বৈদেশিক দেনা পরিশোধে রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

চলতি অর্থবছরের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ২ হাজার ৭৯৯ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ফলে এ সময়ের মধ্যে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ দশমিক ৪ শতাংশে।

নিচে রেমিট্যান্স প্রবাহের তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো—

সময়কালরেমিট্যান্স প্রবাহপ্রবৃদ্ধি
১–১৫ এপ্রিল ২০২৫১৪৭ কোটি ২০ লাখ ডলার
১–১৫ এপ্রিল ২০২৬১৭৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার২১.৫% বৃদ্ধি
১ জুলাই ২০২৫ – ১৫ এপ্রিল ২০২৬২,৭৯৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার২০.৪% বৃদ্ধি
আগের অর্থবছরের একই সময়২,৩২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের আগ্রহ বৃদ্ধি, হুন্ডি বা অবৈধ অর্থ প্রেরণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, এবং রেমিট্যান্সে সরকারি প্রণোদনা অব্যাহত রাখা।

এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সহজলভ্যতা এবং দ্রুত লেনদেন ব্যবস্থা প্রবাসী আয়ের প্রবাহকে আরও সহজ ও নিরাপদ করেছে বলে মনে করছেন ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাওয়াও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নির্মাণ, গৃহস্থালি কাজ এবং সেবা খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় প্রবাসী আয়ের ধারা আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসগুলোর একটি হওয়ায় এটি শুধু রিজার্ভ বাড়াতেই নয়, বরং টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়াতে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং সেবাকে আরও ডিজিটালাইজড করা, লেনদেন খরচ কমানো এবং প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও সুদৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।