লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েল যদি সব ধরনের সামরিক অভিযান ও হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ না করে, তবে কোনো যুদ্ধবিরতি কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য হবে না। সংগঠনটির মতে, একতরফা শর্তে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় এবং এতে স্থায়ী শান্তির কোনো ভিত্তি তৈরি হয় না।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের বরাতে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা হাসান ফাদলাল্লাহ জানান, স্থল, আকাশ ও সীমান্ত—সব ধরনের শত্রুতামূলক কার্যক্রম বন্ধ না হলে যুদ্ধবিরতি মানার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর এই মন্তব্য এমন সময়ে এসেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে।
ফাদলাল্লাহ আরও জানান, সম্ভাব্য স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাব সম্পর্কে হিজবুল্লাহকে অবহিত করেছেন বৈরুতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত। এতে স্পষ্ট হয় যে, এই সংঘাত কেবল দুই পক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আঞ্চলিক শক্তিগুলোও কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। তবে হিজবুল্লাহর অবস্থান অনুযায়ী, কার্যকর যুদ্ধবিরতির পূর্বশর্ত হলো ইসরায়েলের পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
এদিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প জানান, তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশ শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর হবে। তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান রেজিন কেইন।
এর আগে ওয়াশিংটন ডিসিতে লেবানন ও ইসরায়েলের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। ওই বৈঠককে সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও এখনো কোনো স্থায়ী সমঝোতা ঘোষণা করা হয়নি।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, তিনি এর আগে বিশ্বের নয়টি সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রেখেছেন এবং এই উদ্যোগকে নিজের দশম সফল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে চান। তাঁর মতে, এটি বাস্তবায়ন করতে পারা হবে একটি ঐতিহাসিক সাফল্য।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য পক্ষগুলোর অবস্থান নিচে তুলে ধরা হলো—
| পক্ষ | অবস্থান | মূল দাবি/শর্ত |
|---|---|---|
| হিজবুল্লাহ | যুদ্ধবিরতিতে শর্তসাপেক্ষ সমর্থন | ইসরায়েলকে সব ধরনের হামলা বন্ধ করতে হবে |
| ইসরায়েল | কূটনৈতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ | নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা |
| যুক্তরাষ্ট্র | মধ্যস্থতা ও যুদ্ধবিরতি উদ্যোগ | ১০ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব |
| ইরান (কূটনৈতিক ভূমিকা) | হিজবুল্লাহকে অবহিত ও সমন্বয়কারী | আঞ্চলিক প্রভাব ও আলোচনায় ভূমিকা রাখা |
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দ্রুত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে হিজবুল্লাহ কঠোর অবস্থান নিয়ে বলছে—ইসরায়েলের সামরিক অভিযান পুরোপুরি বন্ধ না হলে কোনো সমঝোতা কার্যকর হবে না।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক ঘোষণা এবং বাস্তব রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
