ব্রাজিল ফুটবলের জৌলুশ হারানোর কারণ

ব্রাজিলের ফুটবল দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী ও নান্দনিক ঘরানা হিসেবে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ঐতিহ্যগত আধিপত্য ও জৌলুশ অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক ও সমর্থক। পাঁচবারের ফিফা বিশ্বকাপজয়ী দলটি ২০০২ সালের পর আর ফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি, এবং একই সময়ে একাধিক বিশ্বমানের তারকার উপস্থিতিও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

এই বাস্তবতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। তিনি ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রাজিলীয় ফুটবলের বর্তমান অবস্থার পেছনে একটি অভ্যন্তরীণ এবং একটি বৈশ্বিক কারণ চিহ্নিত করেন।

রোমারিওর মতে, প্রথম কারণ হলো ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ‘স্ট্রিট সকার’ বা রাস্তার ফুটবলের ধীরে ধীরে বিলুপ্তি। আগে ব্রাজিলের অসংখ্য প্রতিভাবান খেলোয়াড় ফাভেলা বা বস্তি এবং রাস্তাঘাটে অনানুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল খেলে নিজেদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা গড়ে তুলতেন। এই পরিবেশ খেলোয়াড়দের স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, কৌশলগত চিন্তা এবং ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নত করতে বড় ভূমিকা রাখত। কিন্তু আধুনিক সময়ে কাঠামোবদ্ধ একাডেমি ও নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে সেই স্বতঃস্ফূর্ত সৃজনশীলতার জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে বলে রোমারিও মনে করেন।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি আধুনিক ফুটবলে শারীরিক সক্ষমতার অতিরিক্ত গুরুত্বকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান ফুটবল ব্যবস্থায় গতি, শক্তি ও অ্যাথলেটিক সক্ষমতাকে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে শৈল্পিক ফুটবল ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জায়গা কমে যাচ্ছে। এর ফলে ব্রাজিলের মতো স্বাভাবিক সৃজনশীল খেলোয়াড় তৈরির ধারা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা একক দক্ষতায় ম্যাচের ফল পরিবর্তন করতে পারে এমন খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছে।

এই পরিবর্তনের প্রভাব ব্রাজিলের ব্যালন ডি’অর জয়ের পরিসংখ্যানেও দেখা যায়। ২০০৭ সালে কাকার পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ব্রাজিলীয় খেলোয়াড় এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিততে পারেননি। নেইমার একাধিকবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছাতে পারেননি। সাম্প্রতিক সময়ে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও আলোচনায় থাকলেও তিনি এককভাবে অন্যদের থেকে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারেননি।

নিচের সারণিতে রোমারিওর উল্লিখিত প্রধান কারণ ও তার প্রভাব সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

কারণবিবরণপ্রভাব
স্ট্রিট সকারের বিলুপ্তিফাভেলা ও রাস্তাঘাটে অনানুষ্ঠানিক ফুটবলের কমে যাওয়াস্বাভাবিক সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত দক্ষতা হ্রাস
শারীরিক সক্ষমতার আধিক্যআধুনিক ফুটবলে গতি ও শক্তির ওপর বেশি গুরুত্বশৈল্পিক ফুটবল ও একক নৈপুণ্য কমে যাওয়া

রোমারিও আরও উল্লেখ করেন যে, আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপ সামনে রেখে ব্রাজিল এখন আর কোনো একজন খেলোয়াড়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকতে পারে না। তাঁর মতে, দলীয় ভারসাম্যই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পাশাপাশি জোয়াও পেদ্রো ও এস্তেভাওয়ের মতো তরুণ প্রতিভাদের ওপর দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।

সব মিলিয়ে রোমারিওর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্রাজিলের ফুটবলের বর্তমান পরিবর্তন কেবল ফলাফলের নয়, বরং খেলোয়াড় তৈরির মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তনেরও প্রতিফলন।