হরমুজে কর্তৃত্বে ইরানের কৌশলগত সুবিধা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিকে ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ইরান যে কৌশলগত প্রভাব বিস্তার করেছে, তা এই সমঝোতার মূল শক্তি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বে মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এবং ইউরিয়া সারের এক-তৃতীয়াংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ খোলা বা বন্ধ রাখার ক্ষমতা কার্যত বৈশ্বিক বাজারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তির তুলনায় ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করেই ইরান অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেলের বাজারে সাময়িক স্বস্তি ফিরে এলেও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। অপরিশোধিত তেলের দাম সাম্প্রতিক সময়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমলেও বাজারের ভঙ্গুরতা রয়ে গেছে।

নিম্নে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব ও সাম্প্রতিক প্রভাবের একটি সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—

বিষয়পরিমাণ/তথ্য
বৈশ্বিক তেল পরিবহনপ্রায় ২০%
প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনউল্লেখযোগ্য অংশ
ইউরিয়া রপ্তানিপ্রায় ১/৩
ইরানের দৈনিক তেল রপ্তানি (মার্চ)১৮.৫ লাখ ব্যারেল
স্বাভাবিক ছাড়মূল্যব্রেন্টের চেয়ে প্রায় ১০ ডলার কম
সাম্প্রতিক বিক্রয়মূল্য (চীন)ব্রেন্টের চেয়ে প্রায় ৩ ডলার বেশি
সম্ভাব্য ট্রানজিট ফিপ্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ডলার

ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকার ফলে এশিয়া ও ইউরোপে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইন ইতোমধ্যে জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে, আর ইউরোপে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এমনকি জ্বালানি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ লক্ষ্য করা গেছে।

বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইরান এই প্রণালিকে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করছে। একদিকে তারা বিশ্ববাজারে প্রভাব বিস্তার করছে, অন্যদিকে উচ্চমূল্যে তেল বিক্রি করে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রকেও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হয়েছে।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভবিষ্যতে এই জলপথ ব্যবহারের জন্য স্থায়ী মাশুল বা টোল আরোপের পরিকল্পনা। ইতোমধ্যে কিছু জাহাজের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের খবর পাওয়া গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, এই যুদ্ধবিরতি কেবল সামরিক সংঘাতের সাময়িক বিরতি নয়; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তারের এক জটিল কৌশলগত বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।