খুলনার জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও একদল অসাধু চক্রের কারসাজিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলনির্ভর একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। ভোর থেকেই শত শত মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে এই সারির বড় অংশ প্রকৃত চালকদের নয়, বরং পেশাদার তেল সংগ্রাহকদের। তারা কৌশলে একই দিনে একাধিকবার তেল নিচ্ছে। প্রথমে নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সংগ্রহ করে কাছাকাছি স্থানে ড্রামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, এরপর পুনরায় লাইনে দাঁড়িয়ে আবার তেল নেওয়া হচ্ছে। কখনও পোশাক পরিবর্তন করে কিংবা ভিন্ন পাম্পে গিয়ে একই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
এইভাবে স্বল্প পরিমাণে বারবার তেল সংগ্রহ করে একটি বড় মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। পরে সেই তেল খুচরা বাজারে লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ ভোক্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজারে অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ছে। অনেক সাধারণ চালকও ভবিষ্যতের আশঙ্কায় একাধিকবার তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কিছু পেট্রোল পাম্প কর্তৃপক্ষ এই অনিয়ম ঠেকাতে উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। কোনো কোনো পাম্পে মোটরসাইকেলের চাকা রং দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে, যাতে একই যানবাহন পুনরায় তেল নিতে না পারে। কিন্তু সিন্ডিকেট সদস্যরা পাশের অন্য পাম্পে গিয়ে সহজেই সেই বাধা এড়িয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইচ্ছাকৃতভাবে তেল থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন। পরে সেই তেল বাইরে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযানে ইতোমধ্যে কয়েকটি পাম্পে জরিমানা করা হয়েছে। কোথাও কোথাও তেল কম মাপ দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তেল সংগ্রহ করে তা কালোবাজারে বিক্রির ঘটনাও সামনে এসেছে।
নিচে পরিস্থিতির মূল দিকগুলো একটি ছকে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বর্তমান চিত্র |
|---|---|
| সরবরাহ পরিস্থিতি | মোটামুটি স্বাভাবিক |
| সংকটের ধরন | কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত |
| মূল কারিগর | মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট |
| অতিরিক্ত মূল্য | লিটারপ্রতি ১০০–১৫০ টাকা বেশি |
| প্রশাসনিক পদক্ষেপ | জরিমানা ও অভিযান |
| সম্ভাব্য সমাধান | নিবন্ধনভিত্তিক ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ |
খুলনার জ্বালানি ডিপোগুলোর তথ্যমতে, আগের বছরের তুলনায় সরবরাহে বড় কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাজারে চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে, যা মূলত এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ডের ফল।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। প্রতিটি যানবাহনের নিবন্ধন নম্বর অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় অন্তর তেল নেওয়ার সীমা নির্ধারণ করা হলে একাধিকবার তেল নেওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে। পাশাপাশি কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং সাধারণ মানুষ স্বস্তি পাবে।
