খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই এপ্রিল ২০২৬, ৫:৫৮ পিএম

আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া একাধিক অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চাপের কারণে অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা—সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে একটি “চাপের বাজেট” হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও স্পষ্টভাবে পড়ছে। নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, সরকারকে এমন এক সময় বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা এবং দেশের ভেতরে কাঠামোগত দুর্বলতা একসঙ্গে বিদ্যমান। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় ও চলতি ব্যয় নির্বাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যমান ঋণের বোঝা এবং নতুন ঋণ গ্রহণের সীমিত সক্ষমতা সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিনিময় হারেও অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেটকে শুধু ব্যয় ও আয় নির্ধারণের দলিল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। বরং এটি হওয়া উচিত একটি সংস্কারমুখী অর্থনৈতিক রোডম্যাপ, যেখানে রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর আদায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা খাতে লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি বলে তারা মত দেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যাবে। এর ফলে বাজারে চাহিদা কমে যেতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি খাতে ব্যয়ের চাপ বাড়লে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অবকাঠামো উন্নয়নেও প্রভাব ফেলবে।
নিচের সারণিতে আসন্ন বাজেটের প্রধান চাপ ও তার সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হলো—
| চাপের ক্ষেত্র | বর্তমান অবস্থা | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|---|
| জ্বালানি ব্যয় | আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা | আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ |
| মূল্যস্ফীতি | উচ্চ পর্যায়ে বিদ্যমান | জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস |
| রাজস্ব আহরণ | লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে | বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি ও ঋণনির্ভরতা বাড়া |
| বৈদেশিক মুদ্রা বাজার | অস্থিরতা বিদ্যমান | বিনিময় হার চাপ ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি |
| ঋণ পরিস্থিতি | পূর্ববর্তী ঋণের বোঝা বিদ্যমান | নতুন ঋণ গ্রহণের ওপর চাপ বৃদ্ধি |
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বহুমাত্রিক এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। রাজস্ব খাতের সংস্কার, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস এবং উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল পথে আনা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সহনশীলতা গড়ে তুলতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
সবশেষে বলা যায়, আসন্ন অর্থবছরের বাজেট কেবল একটি আর্থিক পরিকল্পনা নয়, বরং এটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য