বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী করতোয়া নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে। বহু বছর ধরে দখল, দূষণ ও নাব্যতা হ্রাসের ফলে নদীটি আজ প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে প্রায় ২৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীপথ পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানায়, প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির আসন্ন সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে এটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে করতোয়া নদীর পাশাপাশি ইছামতী ও গজারিয়া নদীতেও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসবে, যা অঞ্চলের সার্বিক জলব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
বর্তমানে করতোয়া নদীর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। শহরের বিভিন্ন নর্দমা ও বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ায় দূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক স্থানে নদী ভরাট হয়ে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে নদীর তীরবর্তী জনগোষ্ঠী পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় নদী পুনঃখননের পাশাপাশি তীর সংরক্ষণ, বাঁধ নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান তৈরির পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, একসময় করতোয়া নদী ছিল এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। নদীপথে পণ্য পরিবহন, মাছ ধরা এবং নৌযান চলাচল ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। কিন্তু বিগত শতাব্দীর আশির দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে নির্মিত বাঁধ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এর ফলে ধীরে ধীরে নদীটির নাব্যতা কমতে থাকে এবং একপর্যায়ে এটি মৌসুমি নদীতে পরিণত হয়।
নিচে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| প্রকল্পের ধরন | নদী পুনঃখনন ও পুনর্বাসন |
| সম্ভাব্য ব্যয় | ১,১২২ কোটি টাকা |
| পুনঃখননের পরিধি | প্রায় ২৩০ কিলোমিটার |
| বাস্তবায়নকাল | অনুমোদন থেকে ২০৩০ সালের জুন |
| ভূমি অধিগ্রহণ | প্রায় ২৪ হেক্টর |
| সংশ্লিষ্ট এলাকা | ৯টি উপজেলা |
| অর্থের উৎস | দেশীয় তহবিল |
প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, করতোয়া নদী একসময় তিস্তা নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা ছিল। ১৭৮৭ সালের বন্যায় তিস্তার গতিপথ পরিবর্তিত হলে করতোয়া তার উৎস হারায় এবং ধীরে ধীরে বৃষ্টিনির্ভর নদীতে পরিণত হয়। বর্ষা মৌসুম ছাড়া নদীতে পানি না থাকায় এটি দখল ও ভরাটের শিকার হয়।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার হবে। একই সঙ্গে নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত রাখা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে এর সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
