বীর মুক্তিযোদ্ধা রুমীর ৭৩তম জন্মবার্ষিকী

আজ ২৯ মার্চ—বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অম্লান এক বীরের জন্মদিন। শহীদ শাফী ইসলাম রুমীর ৭৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশ গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেই তরুণকে, যিনি মাত্র বিশ বছর বয়সে নিজের সম্ভাবনাময় জীবন ত্যাগ করে স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন।

১৯৫১ সালের ২৯ মার্চ ঢাকার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেন রুমী। তাঁর পিতা শরীফ ইমাম এবং মাতা জাহানারা ইমাম ছিলেন সংস্কৃতিমনা ও প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। সন্তানের নাম ‘রুমী’ রাখা হয় মহান দার্শনিক কবি জালালুদ্দীন রুমীর অনুপ্রেরণায়—যেন তিনি জ্ঞান, মানবতা ও আদর্শের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।

রুমী শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি হন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পান যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামকরা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর পড়াশোনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা তাঁর জীবনপথ বদলে দেয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে রুমী বিদেশে নিরাপদ জীবনের সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে দেশের মুক্তির সংগ্রামে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সীমান্ত পেরিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং সেক্টর–২-এর অধীনে গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুন’-এ যুক্ত হন।

তাঁর নেতৃত্বে ও অংশগ্রহণে ঢাকায় একাধিক সাহসী অভিযান পরিচালিত হয়। এর মধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা এবং ধানমণ্ডি এলাকায় গেরিলা আক্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব অভিযানে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, সাহসী এবং কৌশলী যোদ্ধা।

১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে তাঁর বাসা থেকে আটক করে। এরপর তাঁকে অমানবিক নির্যাতনের মুখে ফেলা হলেও তিনি কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। তাঁর এই দৃঢ়তা ও নীরবতা ছিল এক অনন্য বীরত্বের প্রতীক। ধারণা করা হয়, ৪ সেপ্টেম্বর তিনি শহীদ হন।

রুমীর জীবন ও সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্ম২৯ মার্চ ১৯৫১
পরিবারশরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমামের সন্তান
শিক্ষাএসএসসি, এইচএসসি, প্রকৌশল শিক্ষায় ভর্তি
মুক্তিযুদ্ধে যোগদান১৯৭১ সাল, সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমে
সামরিক এলাকাসেক্টর–২
গেরিলা দলক্র্যাক প্লাটুন
উল্লেখযোগ্য অভিযানসিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র হামলা, ধানমণ্ডি অভিযান
গ্রেফতার২৯ আগস্ট ১৯৭১
শহীদ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

জন্মদিনে তাঁর মা জাহানারা ইমাম ও পিতা শরীফ ইমাম তাঁকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন—বজ্রের মতো শক্তিশালী হতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং দেশের সম্মান রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে। রুমী সেই আশীর্বাদ বাস্তবায়ন করেছিলেন নিজের জীবনের বিনিময়ে।

আজ, স্বাধীনতার এত বছর পরেও রুমী বেঁচে আছেন ইতিহাসের পাতায় এক অমর তরুণ হিসেবে। তাঁর সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অধ্যায়কে চিরকাল আলোকিত করে রাখবে।