ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতি উন্নত দেশগুলোর নব্য ঔপনিবেশিক হুমকি প্রতিরোধের জন্য তীব্র আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছেন। শনিবার (২১ মার্চ) কলম্বিয়ার বোগোতায় অনুষ্ঠিত লাতিন আমেরিকান ও ক্যারিবীয় রাষ্ট্রগুলোর জোট ‘সিইএলএসি’-এর ১০ম শীর্ষ সম্মেলনে তিনি বলেন, “তারা আমাদের আবারও উপনিবেশ বানাতে চায়।”
লুলার বক্তব্যের প্রেক্ষাপট
লুলা সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাম উল্লেখ না করলেও তার বক্তৃতায় স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে, যেমন— ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোর ওপর হুমকি এবং কিউবার ওপর জ্বালানি অবরোধ। তিনি প্রশ্ন তুলেন, “কারো পক্ষে কি ভাবা সম্ভব যে অন্য দেশের মালিক হওয়া যায়? কিউবা ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হচ্ছে, তা কি গণতান্ত্রিক?”
লুলা আফ্রিকার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে উচ্চপর্যায়ের ফোরামে বলেন, ঐতিহাসিকভাবে লাতিন আমেরিকান দেশগুলো সোনা, রূপা, হীরা ও খনিজ সম্পদে লুণ্ঠিত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের যা কিছু ছিল তা কেড়ে নেওয়ার পর, তারা আমাদের বিরল খনিজ ও দুর্লভ মৃত্তিকার মালিক হতে চায়। আমাদের আবারও উপনিবেশ বানানোর চেষ্টা চলছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ব্রাজিলের বিশাল খনিজ সম্পদ ও ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক শুল্ক নীতির প্রেক্ষাপটে লুলার মন্তব্য আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করছে। গত বছর মার্কিন প্রশাসন ব্রাজিলের পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
সামরিক হস্তক্ষেপ ও জাতিসংঘের ব্যর্থতা
লুলা ইরান ও ইরাক যুদ্ধের মধ্যে একটি সমান্তরাল টানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “পারমাণবিক বোমা তৈরির অজুহাতে এখন ইরান আক্রমণ করা হচ্ছে। সাদ্দাম হোসেনের রাসায়নিক অস্ত্র কোথায় ছিল? কে তা খুঁজে পেয়েছিল?” লুলা স্পষ্ট করেন, কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন বরদাস্ত করা হবে না।
তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের আহ্বান জানান, কারণ পাঁচটি স্থায়ী দেশের ভেটো ক্ষমতার কারণে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই বক্তব্যে যোগ করেন যে, যুদ্ধ থামানোর জন্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি এখন কেবল যুদ্ধের সাক্ষী।
সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক প্রভাব
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| সম্মেলন | সিইএলএসি ১০ম শীর্ষ সম্মেলন |
| স্থান | বোগোতা, কলম্বিয়া |
| তারিখ | ২১ মার্চ ২০২৬ |
| প্রধান বক্তা | লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, ব্রাজিল |
| অংশগ্রহণকারী দেশ | ব্রাজিল, উরুগুয়ে, বুরুন্ডি, কলম্বিয়া, গায়ানা, সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডাইনস |
| মূল বক্তব্য | উন্নত দেশের নব্য ঔপনিবেশবাদ ও ভূ-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা |
| উল্লেখযোগ্য ইস্যু | ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ইরান, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জাতিসংঘ সংস্কার |
লুলার বক্তৃতা মূলত ‘মনরো ডকট্রিন’ বা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন প্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে চতুর্থ মেয়াদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী লুলা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও নব্য ঔপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছেন। তবে সম্মেলনে সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত না থাকায় লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বিভাজনও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উপসংহার: লুলার বক্তব্য শুধু নব্য ঔপনিবেশিক হুমকি প্রতিরোধের নয়, এটি দক্ষিণ–দক্ষিণ সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশের সার্বভৌম অধিকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সচেতনতা বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, সিইএলএসি সম্মেলন প্রতিবেদন।
