স্মরণে বিপ্লবী বীর মাস্টারদা সূর্যসেন

বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসে কিছু নাম অমর দীপশিখার মতো চিরজ্বলন্ত। সূর্য সেন তাদের অন্যতম। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে যেসব বাঙালি তরুণ অকুতোভয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন এই মহান বিপ্লবী। মৃত্যুকে তুচ্ছ করে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা ইতিহাসে চিরন্তনভাবে সঞ্চিত।

১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া গ্রামে সূর্য সেনের জন্ম। পিতা রাজমণি সেন ও মাতা শশীবালার স্নেহে শৈশব শুরু হলেও মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি পিতৃহীন হন। এরপর বড় কাকা গৌরমণি সেনের স্নেহ-আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেন, যেখানে মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের বীজ ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হতে থাকে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলেও, দীর্ঘ দুই শতকের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের অন্ধকারে সূর্যসেনের মতো বিপ্লবীরা মুক্তির অগ্নিশিখা জ্বালান। তাঁদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের পথ ধরেই স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হতে থাকে।

কলেজ জীবনেই সূর্য সেন বিপ্লবী চেতনার সঙ্গে পরিচিত হন। শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হলেও, মূল লক্ষ্য ছিল তরুণ সমাজকে স্বাধীনচেতা করা। চট্টগ্রামের উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল পাঠদান করেননি, শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে স্বাধীনতার বীজ বপনও করেছিলেন। এ থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন সবার প্রিয় ‘মাস্টারদা’।

তিনি ছিলেন বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর-এর সক্রিয় সদস্য। বারবার গ্রেফতার, কারাবাস ও নির্যাতনও তাঁকে থামাতে পারেনি। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে তাঁর নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। ঐ রাতে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে তিনি ঘোষণা করেন ‘স্বাধীন চট্টগ্রাম’। এই অভিযান ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল।

এই সাহসী অভিযানে তাঁর সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন বিপ্লবীকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার—নারীর সাহস ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক।

দীর্ঘ আত্মগোপনের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন। কারাগারে তাঁর উপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। ১৯৩৩ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি কার্যকর করা হয়। ব্রিটিশরা জনরোষ এড়াতে তাঁর মরদেহ বঙ্গোপসাগরে ভাসিয়ে দেয়।

সূর্য সেনের সংক্ষিপ্ত জীবনসারাংশ

বিষয়তথ্য
জন্ম২২ মার্চ ১৮৯৪, নোয়াপাড়া, রাউজান, চট্টগ্রাম
পিতা-মাতারাজমণি সেন ও শশীবালা সেন
শিক্ষাজীবনউমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় শিক্ষক
বিপ্লবী সংগঠনযুগান্তর
ঐতিহাসিক অভিযানচট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ১৮ এপ্রিল ১৯৩০
মৃত্যুদণ্ড১৯৩৩, কার্যকর ১২ জানুয়ারি ১৯৩৪
মরদেহবঙ্গোপসাগরে ভাসানো হয়েছে

মাস্টারদা সূর্যসেনের আদর্শ আজও বেঁচে আছে প্রতিটি স্বাধীনতার স্বপ্নে, প্রতিবাদের চেতনায় ও সাহসী উচ্চারণে। তিনি কেবল একজন বিপ্লবী নন, তিনি এক অনুপ্রেরণা, এক আলোকবর্তিকা। বাংলার স্বাধীনচেতা মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরস্মরণীয়, চিরঅম্লান।

গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।