গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে প্রথম দফার হামলার পর সংঘাতটি দ্রুত বিস্তৃত হয়ে আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেয়। ২ মার্চ ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের এক শীর্ষ উপদেষ্টা হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, কারণ এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
একই সময়ে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে চাপ তৈরি হলেও সোনার দাম প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। সাধারণত যুদ্ধ বা অর্থনৈতিক সংকটের সময় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ফলে দাম দ্রুত বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
গত এক বছরে সোনার দাম ইতোমধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এটি আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে দাম সেই স্তরের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। বুধবার সকালে নিউইয়র্ক স্পট মার্কেটে সোনার দাম ছিল আউন্সপ্রতি ৪,৯৯১ ডলার, যা আগের দিনের তুলনায় সামান্য কম। অন্যদিকে, এপ্রিলে সরবরাহযোগ্য ফিউচার চুক্তিতে দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪,৯৯৮ ডলার।
নিচের সারণিতে সোনার সাম্প্রতিক মূল্যচিত্র তুলে ধরা হলো—
| সূচক | মূল্য (ডলার/আউন্স) |
|---|---|
| জানুয়ারির সর্বোচ্চ | ৫,০০০+ |
| বর্তমান স্পট মূল্য | ৪,৯৯১ |
| ফিউচার মূল্য (এপ্রিল) | ৪,৯৯৮ |
| বার্ষিক বৃদ্ধি (২০২৫) | ৭০%+ |
বিশ্লেষকদের মতে, সোনার দাম স্থির থাকার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা। মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকায় সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা কমে গেছে, বরং তা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এতে ডলারে বিনিয়োগ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ডলার শক্তিশালী হলে সাধারণত সোনার চাহিদা কমে যায়, কারণ সোনায় বিনিয়োগে সুদ পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে ডলার নিজেও একটি নিরাপদ বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা সোনার পরিবর্তে ডলারকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।
আরেকটি বড় কারণ হলো, সোনার দাম ইতোমধ্যেই অনেক বেশি। বছরের শুরু থেকেই উচ্চমূল্যে লেনদেন হওয়ায় নতুন করে যুদ্ধের প্রভাব দামকে তেমন উঁচুতে তুলতে পারছে না। অনেক বিনিয়োগকারী এখন সোনাকে নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে কিছুটা জল্পনানির্ভর সম্পদ হিসেবে দেখছেন।
তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হয় এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়, তাহলে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ আবারও বাড়তে পারে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভ যদি সুদের হার কমানোর ইঙ্গিত দেয়, তাহলে সোনার দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রচলিত অর্থনৈতিক নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধকালীন সময়ে সোনার দাম বাড়ার কথা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা ঘটছে না। বাজার এখন এক জটিল ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে, যেখানে ডলার শক্তি, সুদের হার এবং পূর্ববর্তী মূল্যবৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সোনার গতিপথ নির্ধারণ করছে।
