ভাইয়ের পরিকল্পনায় রাজু শেখ হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য

ফরিদপুর শহরে রাজু শেখ (৩৬) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন নিহতেরই ছোট ভাই ইব্রাহিম শেখ (২৬)। পারিবারিক বিরোধ, প্রতিশোধের মনোভাব এবং মাদকসংক্রান্ত আর্থিক দ্বন্দ্বের জটিলতা মিলিয়েই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুরে ফরিদপুর জেলা পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম তাঁর কার্যালয় চত্বরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ঘটনার পর পুলিশ প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, গোয়েন্দা তথ্য এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনাপ্রবাহ

নিহত রাজু শেখ ফরিদপুর শহরের ২ নম্বর কুটিবাড়ি মহল্লার স্টেশন বাজার মুসলিম কলোনি এলাকার বাসিন্দা। গত ২ মার্চ রাত প্রায় ১০টার দিকে ফরিদপুর শহরের স্টেশন বাজার এলাকার একটি মাংসের দোকানের সামনে তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত।

হামলার সময় রাজু শেখ গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যান। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনার পরদিন ৩ মার্চ নিহতের মা ছবি বেগম ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। তবে মামলার এজাহারে ছোট ভাই ইব্রাহিম শেখের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

তদন্তে বেরিয়ে আসে পারিবারিক দ্বন্দ্ব

পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম জানান, তদন্তের একপর্যায়ে জানা যায় যে রাজু শেখ স্থানীয়ভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। মাদক লেনদেনকে কেন্দ্র করে আর্থিক বিরোধ এবং পারিবারিক কলহ দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।

তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার তিন দিন আগে রাজু শেখ ও তাঁর ছোট ভাই ইব্রাহিম শেখের মধ্যে তীব্র ঝগড়া হয়। সেই সময় রাজু ধারালো অস্ত্র দিয়ে ইব্রাহিমকে আঘাত করেন। এ ঘটনায় ইব্রাহিম ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন।

পরে তিনি তাঁর পরিচিত কয়েকজন সহযোগী—হৃদয়, সাকিব, রবিউল, মারুফ ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করেন। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজুকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় এবং ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাঁকে হত্যা করা হয়।

মাদক ব্যবসা ও অর্থনৈতিক বিরোধ

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমির হোসেন বলেন, নিহত রাজু শেখের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে চারটি মামলা রয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, তিনি অভিযুক্ত হৃদয়ের মা ও শাশুড়ি এবং স্বপ্ন নামের ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক সংগ্রহ করে তা বিক্রি করতেন।

কিন্তু মাদক বিক্রির টাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের না দিয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এতে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং এই ক্ষোভ হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযান

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পালিয়ে যায়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযান চালায়।

অভিযানে পাবনার সাঁথিয়া থানা এলাকা এবং ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে এ পর্যন্ত মোট আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার রাতে কোতোয়ালি থানার হাবেলী গোপালপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চারটি চাপাতি ও একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়।

মামলার অগ্রগতির সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়তথ্য
নিহত ব্যক্তিরাজু শেখ (৩৬)
প্রধান পরিকল্পনাকারীইব্রাহিম শেখ (ছোট ভাই)
ঘটনার তারিখ২ মার্চ, রাত
ঘটনার স্থানস্টেশন বাজার, ফরিদপুর
দায়েরকৃত মামলাহত্যা মামলা, কোতোয়ালি থানা
গ্রেপ্তার৮ জন
উদ্ধার অস্ত্র৪টি চাপাতি ও ১টি ছুরি
নিহতের বিরুদ্ধে মামলামাদক আইনে ৪টি

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) ফাতেমা ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) শামসুল আজম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজমির হোসেন এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলামসহ জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং জড়িত অন্যদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযান জোরদার করা হয়েছে।