নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কিশোর মুস্তাকিম হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি মাসুম মিয়া ওরফে চায়না মাসুমকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের ৩৯ দিন পর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। গ্রেপ্তারের পর সোমবার আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তার হওয়া মাসুম মিয়া (২৫) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার শ্রীনগর ইউনিয়নের সায়েদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মালেক মিয়ার ছেলে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং বিভিন্ন স্থানে অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। অবশেষে গোপন তথ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রায়পুরা থানার উপপরিদর্শক মোহাম্মদ শফিউল্লাহ শিকদারের নেতৃত্বে একটি পুলিশ দল শ্রীমঙ্গলে অভিযান চালায়। সেখানে রেলস্টেশন–সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর রোববার দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাতে তাকে রায়পুরা থানায় নিয়ে আসা হয় এবং সোমবার আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রায়পুরার চরাঞ্চলের সায়েদাবাদ এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দুটি প্রভাবশালী পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। এক পক্ষের নেতৃত্ব দেন হানিফ মাস্টার এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন এরশাদ মিয়া। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিকবার উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ভোর প্রায় ছয়টার দিকে এরশাদ মিয়ার অনুসারীরা আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হানিফ মাস্টারের অনুসারীদের বাড়িঘরে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় হামলার প্রতিরোধ করতে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় কিশোর মুস্তাকিম।
নিহত মুস্তাকিম স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা মাসুদ রানা সৌদি আরবে কর্মরত। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় মুস্তাকিম ঘুম থেকে উঠে বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে ছিল। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ছোড়া গুলি তার বুকের বাঁ পাশে বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাতে নিহত কিশোরের মা শাহানা বেগম বাদী হয়ে রায়পুরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় মাসুম মিয়া ওরফে চায়না মাসুম, তার বাবা মালেক মিয়াসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
মামলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| হত্যার তারিখ | ৪ ফেব্রুয়ারি |
| স্থান | সায়েদাবাদ গ্রাম, শ্রীনগর ইউনিয়ন, রায়পুরা |
| নিহত | কিশোর মুস্তাকিম, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী |
| প্রধান আসামি | মাসুম মিয়া ওরফে চায়না মাসুম (২৫) |
| গ্রেপ্তারের স্থান | শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন এলাকা |
| গ্রেপ্তারের সময় | ঘটনার ৩৯ দিন পর |
| আইনি অগ্রগতি | আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি |
রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামির বিরুদ্ধে আগেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি বলেন, “মুস্তাকিম হত্যা মামলার প্রধান আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্যও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, চরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই উত্তেজনা তৈরি হয়। তারা আশা করছেন, হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলে এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। পুলিশও জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
