বাংলার বৌদ্ধিক ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটে যারা নিভৃত নক্ষত্রের মতো আলো ছড়ান, কিন্তু প্রচারের কেন্দ্রে থাকেন না। আরজ আলী মাতুব্বর এমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যুক্তিবাদ, সংশয়বাদ ও মানবতাবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষার মননজগতে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
Table of Contents
শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা
১৩০৭ বঙ্গাব্দের ৩ পৌষে বরিশালের প্রত্যন্ত লামচরি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আরজ আলী মাতুব্বর। গ্রামটি ছিল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানবিহীন। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য তিনি গ্রামের বিদ্যোৎসাহী আব্দুল করিম মুন্সির স্থাপিত মক্তবে শিক্ষালাভ শুরু করেন। যদিও প্রাথমিক বই হিসেবে সীতারাম বসাকের “আদর্শ লিপি” ছিল তাঁর হাতের মধ্যে, মক্তবটি অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অল্পই লাভ করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি তাঁর জ্ঞানসাধনার চেষ্টা। বরিশালের ছাত্রদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে তিনি পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরি ও ব্রজমোহন কলেজ লাইব্রেরিতে নিয়মিত সময় কাটাতেন। কলেজের দর্শনশাস্ত্র অধ্যাপক গোলাম কাদির ছিলেন তাঁর জ্ঞানচর্চার অন্যতম পথপ্রদর্শক।
পরবর্তীতে নিজের গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন “আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি”, যা তাঁর চিন্তাশীলতার স্থায়ী প্রতীক হিসেবে স্বীকৃত।
জীবনসংগ্রাম ও মানবতাবাদ
কিশোর বয়সেই পিতৃহারা হওয়া, জমি নিলামে চলে যাওয়া—এসব প্রতিকূলতা তাঁকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি করে। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর মায়ের ছবি তোলার অনুরোধ গ্রামবাসীর ধর্মবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করা—এই ঘটনার প্রভাব তাঁর মানবতাবাদের ভিত্তি গড়ে তোলে।
“কীভাবে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার মানুষের মানবিকতাকেও অস্বীকার করতে পারে?”—এই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় তাঁর সত্য অনুসন্ধান। ধর্ম, সমাজ ও প্রচলিত বিশ্বাসকে তিনি অন্ধভাবে মেনে নেননি। তাঁর দর্শন ছিল যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে বিচার করার। নিজস্ব অবস্থান স্পষ্ট—“আমাদের অভিযান কুসংস্কারের বিরুদ্ধে, কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়।”
সংশয়বাদ ও সাহিত্য
আরজ আলী মাতুব্বর বাংলায় সংশয়বাদী দর্শনের এক শক্তিশালী ধারা তৈরি করেন। তাঁর মতে, সন্দেহ ও প্রশ্ন জ্ঞানের অপরিহার্য সূচনা। সমাজে প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাস, অলৌকিকতার মোহ এবং যুক্তিহীন সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।
| গ্রন্থের নাম | বিষয়বস্তু | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| সত্যের সন্ধান | সংশয়বাদী চিন্তাধারা | বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য দলিল |
| অনুমান | যুক্তি ও দার্শনিক আলোচনা | সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষা |
| মুক্তমন | সমাজ ও মানবতার প্রতিফলন | দর্শনশাস্ত্র ও যুক্তির সংমিশ্রণ |
| সৃষ্টির রহস্য | বিজ্ঞান ও জ্ঞানের বিস্তৃত আলোচনা | ক্ষুদ্র বিশ্বকোষের মতো ব্যবহারযোগ্য |
| স্মরণিকা | জীবনের অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারা | প্রাঞ্জল ও অলংকারহীন ভাষা |
বিশিষ্ট মনীষী আহমদ শরীফ বলেন—“আরজ আলী মাতুব্বরের লেখায় নতুন তত্ত্বের চেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তাঁর মুক্তবুদ্ধি ও সৎ সাহস।” সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখ করেছেন—“তিনি বর্ণনা করেননি, প্রশ্ন করেছেন; আর সেই প্রশ্নই পাঠককে চিন্তায় দাঁড় করায়।” কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তাঁকে রেনেসাঁস মানুষের সমতুল্য বলে অভিহিত করেছেন।
জীবনের শেষ এবং অমর দান
মানবতাবাদী এই চিন্তক জীবনের শেষ সময়েও দান ও শিক্ষার উদাহরণ স্থাপন করেছেন। মৃত্যুর আগে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের জন্য দান করেছেন চোখ ও দেহ। তাঁর ভাষায়—“ছাত্ররা যদি আমার দেহ কেটে কিছু শেখে, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে।”
১৩৯২ বঙ্গাব্দে বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর চিন্তা, প্রশ্ন ও যুক্তির প্রতি অটল বিশ্বাস আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রমাণ করেছেন যে জ্ঞান অর্জনের জন্য ডিগ্রি নয়, প্রয়োজন মুক্তচিন্তা ও সত্য অনুসন্ধানের অদম্য ইচ্ছা।
আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে বাংলা সমাজ বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন করছে, এক মনীষীর প্রতি যিনি যুক্তি ও মানবতার আলোকবর্তিকা হয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল।
