ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী মিসাইলের তীব্র ঘাটতির মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সেমাফরের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই ইসরায়েল তাদের প্রতিরক্ষা মজুত দ্রুত কমে আসার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রকে অবহিত করেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে টানা সামরিক সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ প্রতিরোধী মিসাইল ব্যবহার হওয়ায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৫ সালে সংঘটিত মাত্র বারো দিনের এক তীব্র সামরিক সংঘর্ষে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী ব্যাপক পরিমাণ প্রতিরোধী মিসাইল ব্যবহার করেছিল। সেই সময় থেকেই মজুতের ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়, যা বর্তমান সংঘাতের কারণে আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইসরায়েলের এই সংকট সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র আগেই অবগত ছিল এবং কয়েক মাস ধরে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিরক্ষা মজুত বর্তমানে স্থিতিশীল থাকলেও সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ধারাবাহিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইসরায়েলের দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সাম্প্রতিক হামলাগুলোর কিছুতে ক্লাস্টার বোমা সংযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার শুরু করেছে। এই ধরনের অস্ত্র লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি এসে বিস্ফোরিত হয়ে বহু ক্ষুদ্র বিস্ফোরক ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে প্রতিরোধ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। এতে প্রতিরোধী মিসাইল দ্রুত ব্যয় হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুস্তরবিশিষ্ট হলেও প্রতিটি ব্যবস্থার নির্দিষ্ট কার্যক্ষমতা রয়েছে। যেমন, দেশটির সুপরিচিত আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত স্বল্পপাল্লার রকেট ও মর্টার হামলা প্রতিহত করার জন্য তৈরি। কিন্তু দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে আরও শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল প্রতিরোধী মিসাইল প্রয়োজন হয়।
নিচের সারণিতে ইসরায়েলের প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলোর ব্যবহার ও বৈশিষ্ট্যের সংক্ষিপ্ত তথ্য তুলে ধরা হলো—
| প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | প্রধান ব্যবহার | লক্ষ্যবস্তু |
|---|---|---|
| আয়রন ডোম | স্বল্পপাল্লার হামলা প্রতিরোধ | রকেট ও মর্টার |
| মধ্যম পাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | মধ্যম দূরত্বের আকাশ হামলা প্রতিহত | ড্রোন ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র |
| দূরপাল্লার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ | দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র |
এদিকে কূটনৈতিক পর্যায়েও ইসরায়েল নতুন সহযোগিতার পথ খুঁজছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ড্রোন প্রতিরোধ প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা বিনিময় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। ইউক্রেন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাপক ড্রোন হামলার মোকাবিলা করায় এ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ইরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির দিকে পঞ্চাশটিরও বেশি দফায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েল যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব হামলার অনেকগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হলেও দীর্ঘমেয়াদি সংঘর্ষের ক্ষেত্রে প্রতিরোধী মিসাইলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সংঘাত যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে ইসরায়েলকে দ্রুত নতুন মিসাইল সংগ্রহ বা মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সহায়তা নিতে হতে পারে। অন্যথায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়ে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
