ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও তীব্র উত্তাপ ছড়াল কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড ময়দানের মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শনিবার বিকেলে আয়োজিত এক বিশাল জনসমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করেন এবং আগামী নির্বাচনে পরিবর্তনের ডাক দেন।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তার অবসান ঘটাতেই হবে। তাঁর দাবি, রাজ্যের মানুষ দুর্নীতি ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ এবং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তারা এই সরকারের জবাব দেবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে এবং রাজ্যে নতুন সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষের সমর্থন প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের জনগণ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও উন্নয়নমুখী শাসনব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যদি নতুন সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়, তবে রাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রদান করা হবে। তিনি বলেন, রাজ্যের দরিদ্র মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে।
সমাবেশে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার নাকি কেন্দ্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে না এবং কিছু ক্ষেত্রে সেগুলোকে নিজেদের উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তিনি বিশেষভাবে বিনা খরচের চিকিৎসা কর্মসূচি এবং শ্রমিক কল্যাণসংক্রান্ত পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন।
এদিন প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য প্রায় ১৮ হাজার ৮৬০ কোটি রুপির বিভিন্ন অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এসব প্রকল্পের মধ্যে সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি এবং জনসেবামূলক অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
সমাবেশে যোগ দিতে আসা মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি নিয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, মানুষের এই বিপুল সমাগম রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকেই স্পষ্ট করে। তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া চালানো হবে এবং অপরাধীরা কোনোভাবেই দায়মুক্তি পাবে না।
এদিকে সমাবেশের দিন কলকাতার গিরিশ পার্ক এলাকায় দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সমাবেশে অংশ নিতে যাওয়া একটি মিছিলের সঙ্গে প্রতিপক্ষের সমর্থকদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতি অসম্মানের অভিযোগেরও তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির মর্যাদা রক্ষায় দেশের প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে এবং এ ধরনের ঘটনার জবাব জনগণই দেবে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রাজ্যের নানা প্রান্তে সভা-সমাবেশ, কর্মসূচি এবং প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিজেপিও সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরিবর্তনের দাবিতে একটি যাত্রা কর্মসূচি শুরু করেছিল, যার সমাপ্তি ঘটে কলকাতার এই মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই তীব্র হয়েছে।
| নির্বাচন | মোট আসন | তৃণমূল কংগ্রেস | বিজেপি | অন্যান্য দল |
|---|---|---|---|---|
| বিধানসভা নির্বাচন ২০১৬ | ২৯৪ | ২১১ | ৩ | বামফ্রন্ট ৩২, কংগ্রেস ৪৪ |
| বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ | ২৯৪ | ২১৩ | ৭৭ | অন্যান্য স্বল্পসংখ্যক |
| লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ | ৪২ | ২২ | ১৮ | অন্যান্য ২ |
| লোকসভা নির্বাচন ২০২৪ | ৪২ | ২৯ | ১২ | অন্যান্য ১ |
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দুই প্রধান দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছে। ফলে আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
