হরমুজে জাহাজে হামলা, উত্তেজনা তীব্র

পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে সাম্প্রতিক সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরাকের জলসীমায় একটি তেলের ট্যাংকারে বিস্ফোরকবোঝাই একটি বোটের হামলায় অন্তত এক নাবিক নিহত হয়েছেন এবং দুটি জাহাজ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণরূপে পুড়ে গেছে। বুধবার গভীর রাতে সংঘটিত এই ঘটনাকে আঞ্চলিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

ইরাকি বন্দর কর্তৃপক্ষ, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা এবং ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলার আগে পারস্য উপসাগরের বিভিন্ন স্থানে আরও চারটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইল হামলার শিকার হয়। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে মোট ছয়টি জাহাজের ওপর আক্রমণের ঘটনা সামনে আসে।

ইরাকি কর্মকর্তাদের মতে, হামলার সময় দুটি জাহাজ ইরাকের জলসীমার মধ্যে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে জ্বালানি পণ্য স্থানান্তর করছিল। এই সময় বিস্ফোরকবোঝাই একটি দ্রুতগামী বোট ট্যাংকারটির কাছে এসে আঘাত হানে। বিস্ফোরণের পরপরই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং জাহাজ দুটি অল্প সময়ের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে।

হামলার শিকার জাহাজ দুটি হলো মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘সেফ সি বিষ্ণু’ এবং মাল্টার পতাকাবাহী ‘জেফিরোস’। ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা সোমো জানিয়েছে, ‘সেফ সি বিষ্ণু’ জাহাজটি তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ একটি ইরাকি কোম্পানি ভাড়া নিয়েছিল। অন্যদিকে ‘জেফিরোস’ জাহাজটি বসরা গ্যাস কোম্পানির জ্বালানি পণ্য বহন করছিল।

হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজসমূহ

জাহাজের নামপতাকামালিকানা/চুক্তিঅবস্থানক্ষয়ক্ষতি
সেফ সি বিষ্ণুমার্শাল আইল্যান্ডইরাকি কোম্পানি (সোমোর চুক্তি)ইরাকি জলসীমাসম্পূর্ণরূপে পুড়ে গেছে
জেফিরোসমাল্টাবসরা গ্যাস কোম্পানিইরাকি জলসীমাগুরুতর অগ্নিকাণ্ড
নাম প্রকাশ হয়নি (৪টি)বিভিন্নআন্তর্জাতিক মালিকানাপারস্য উপসাগরপ্রজেক্টাইল হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পৃক্ত জাহাজগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা ইঙ্গিত করছে যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এখন সমুদ্রপথেও বিস্তার লাভ করছে। চলমান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জলপথে হামলার শিকার জাহাজের সংখ্যা অন্তত ১৬টিতে পৌঁছেছে।

এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান। সেই হামলার পর থেকেই পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ফলে এখানে নিরাপত্তা সংকট দেখা দিলে তা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দাম এখন ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস সতর্ক করে বলেছে, দেশটির ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল কিংবা তাদের মিত্রদের কাছে ‘এক লিটার তেলও’ রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। এই হুমকি বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি তেল পরিবহন বন্ধ করার চেষ্টা করে, তবে ওয়াশিংটন আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেবে। তিনি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে ইরানের নৌ সক্ষমতার বড় অংশ ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তাকেই নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আন্তর্জাতিক নৌপথে আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।