ইরানের পাশে দাঁড়াবে আঞ্চলিক বাহিনীও

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো জাতির উদ্দেশে টেলিভিশন ভাষণ দিয়েছেন আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দেওয়া ওই ভাষণে তিনি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, ইরান তার নীতি ও প্রতিরোধ সংগ্রাম থেকে একচুলও সরে আসবে না। তিনি ঘোষণা করেছেন, আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন নিয়ে ইরান তার লড়াই অব্যাহত রাখবে এবং নিহতদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে খামেনি বলেন, ইরান কেবল নিজের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠীও দেশটির পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত রয়েছে। তিনি দাবি করেন, ইয়েমেন ও ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ইতোমধ্যে ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে সমর্থন জানিয়েছে এবং প্রয়োজন হলে সরাসরি পদক্ষেপ নেবে।

তিনি বলেন, “ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধারা তাদের দায়িত্ব পালন করবে। তারা অত্যাচার ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।” একই সঙ্গে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদেরও সমর্থন জানান, যারা ইরানকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী এবং নির্দেশনা পেলেই সক্রিয় ভূমিকা নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির ভাষণে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক জোটরাজনীতির ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন এবং ইরাকের বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এসব গোষ্ঠীর সক্রিয়তা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

সম্ভাব্য আঞ্চলিক মিত্র ও তাদের ভূমিকা

দেশসম্ভাব্য মিত্র গোষ্ঠীভূমিকা ও অবস্থান
ইয়েমেনহুথি বা আনসারুল্লাহ আন্দোলনইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র; আঞ্চলিক সংঘাতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে
ইরাকশিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠীইরানপন্থী সংগঠনগুলো রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন দিয়েছে
ইরানইসলামি প্রজাতন্ত্রের সামরিক বাহিনীদেশের প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়নে নেতৃত্ব প্রদান করছে

ভাষণে খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সংকটের সময়ই সশস্ত্র বাহিনী দেশকে বিভক্তি ও পরাধীনতার হাত থেকে রক্ষা করেছে। তিনি সেনা সদস্যদের “সাহসী যোদ্ধা” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়ভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কঠোর বার্তাও দেন খামেনি। তিনি বলেন, ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী হলেও মার্কিন সামরিক উপস্থিতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো উত্তেজনার অন্যতম মূল কারণ।

তিনি বলেন, “ইরানি বাহিনী বর্তমানে কেবল মার্কিন স্থাপনাগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করছে এবং প্রয়োজন হলে হামলা অব্যাহত থাকবে। এই অঞ্চলের সব মার্কিন ঘাঁটি অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত; অন্যথায় সেগুলো ভবিষ্যতেও আক্রমণের মুখে পড়তে পারে।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্ররা মনে করে, এসব ঘাঁটি তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, নতুন সর্বোচ্চ নেতার এই ভাষণ ইরানের ভবিষ্যৎ কৌশল ও অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তিনি আঞ্চলিক মিত্রদের সক্রিয় সমর্থনের কথা তুলে ধরেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এই প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে, তা এখন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নজরদারির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।