ইসরায়েলে ইরানের বিধ্বংসী গুচ্ছ বোমা হামলা: বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা

মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে সংঘাতের মাত্রা ছাড়িয়ে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে এখন সরাসরি এবং ভয়াবহ মারণাস্ত্রের লড়াই শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলায় ইরান প্রথমবারের মতো বড় আকারে ক্লাস্টার বা গুচ্ছ বোমাবাহী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। গত সোমবার সকালে ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে চালানো এই পৈশাচিক হামলায় গুরুতর আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ নিয়ে এই নির্দিষ্ট হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইজনে।

হামলার প্রেক্ষাপট ও হতাহতের বিবরণ

মঙ্গলবার নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। নিহতরা হলেন ৪০ বছর বয়সী রুস্তম গুলমোভ এবং আমিদ মুর্তুজোভ। তারা দুজনেই পেতাহ তিকভা শহরের বাসিন্দা ছিলেন। ঘটনার সময় তারা ইয়েহুদ শহরের একটি নির্মাণস্থলে কাজ করছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত, আকাশ থেকে ধেয়ে আসা গুচ্ছ বোমার একটি সরাসরি তাদের কর্মস্থলে আঘাত হানে। উদ্ধারকর্মীদের মতে, সাইরেন বাজার পর তারা পর্যাপ্ত সময় পাননি অথবা নিকটস্থ কোনো বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি, যার ফলে এই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।

নিচে ইরানের এই বিশেষ হামলার প্রভাব ও নিশানার একটি তালিকা দেওয়া হলো:

হামলার লক্ষ্যবস্তু (শহর)ক্ষয়ক্ষতির ধরণহতাহতের পরিসংখ্যান
ইয়েহুদনির্মাণস্থলে সরাসরি আঘাত২ জন নিহত (শ্রমিক)
অর ইয়েহুদাআবাসিক এলাকায় বিস্ফোরণ১ জন গুরুতর আহত
পেতাহ তিকভাঅবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ততথ্য সংগৃহীত হচ্ছে
হোলোন ও বাত ইয়ামউন্মুক্ত স্থানে বোমা ছড়িয়ে পড়াকোনো প্রাণহানি ঘটেনি
মোট আক্রান্ত স্থানমধ্যাঞ্চলের অন্তত ৬টি স্থান২ নিহত, ১২+ আহত (সামগ্রিক)

ক্লাস্টার বা গুচ্ছ বোমার ভয়াবহ প্রযুক্তি

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, ইরান এই হামলায় এমন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে যার ‘ওয়ারহেড’ বা অগ্রভাগ আকাশে থাকা অবস্থাতেই খুলে যায়। এরপর এটি একটি নির্দিষ্ট এলাকা জুড়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অসংখ্য বোমা (সাব-মিউনিশন) ছড়িয়ে দেয়। সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র যেখানে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে আঘাত হানে, সেখানে গুচ্ছ বোমা প্রায় ৮ কিলোমিটার (৫ মাইল) ব্যাসার্ধের বিশাল এলাকাজুড়ে মৃত্যুফাঁদ তৈরি করে।

এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • বিস্ফোরকের বিন্যাস: প্রতিটি মূল ক্ষেপণাস্ত্র ২৪ থেকে ৮০টি ছোট বোমা বহন করে।

  • বিস্ফোরণ ক্ষমতা: প্রতিটি ছোট বোমায় প্রায় ২.৫ কেজি বিস্ফোরক থাকে।

  • অনির্দেশিত পতন: এই ছোট বোমাগুলোর নিজস্ব কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না; এগুলো স্রেফ বৃষ্টির মতো নিচে আছড়ে পড়ে।

  • অবিস্ফোরিত ঝুঁকি: অনেক সময় এই ছোট বোমার কিছু অংশ মাটিতে পড়ার পর তাৎক্ষণিক বিস্ফোরিত হয় না, যা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী মাইন বা মরণফাঁদ হিসেবে কাজ করে।

রণক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা ও সামরিক সতর্কতা

ইসরায়েলি হোম ফ্রন্ট কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল শাই ক্লাপার জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। ইয়েহুদ শহরের একটি নির্মাণস্থলে কয়েক ডজন শ্রমিক সময়মতো বাঙ্কারে আশ্রয় নেওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। তবে যারা খোলা জায়গায় ছিলেন বা দেরি করেছেন, তারা প্রাণ হারিয়েছেন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর সাথে আলাপকালে এক ক্রেনচালক জানান, সাইরেন বাজার পর ক্রেন থেকে নিচে নামতেই কয়েক মিনিট সময় লেগে যায়, যা এই ধরনের দ্রুতগামী ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান গড়ে দেয়।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে চলতি বছরের সংঘাতে নিয়মিতভাবে এই ক্লাস্টার মিসাইল ব্যবহার করছে। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও ইরানের দেওয়া এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আক্রমণ শানিয়েছে। এই হামলাগুলো প্রমাণ করে যে, ইরান এখন ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে (আয়রন ডোম বা অ্যারো) ফাঁকি দিতে একক শক্তিশালী ওয়ারহেডের বদলে গুচ্ছ পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে, যাতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সবগুলো ক্ষুদ্র বোমাকে একসাথে ধ্বংস করতে না পারে।

উপসংহার

ইরানের এই কৌশলী ও বিধ্বংসী হামলা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইসরায়েল ইতোমধ্যে এই হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গুচ্ছ বোমার ব্যবহারের নিন্দা জানালেও, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সাধারণ জনবসতি ও শ্রমজীবী মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।