মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ইসরায়েল এবং ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ইরান একযোগে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইরানের অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সামরিক শাখা ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি) এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে পরিচালিত এই অভিযানে ইরান প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
Table of Contents
হামলার বিবরণ ও লক্ষ্যবস্তুসমূহ
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘মেহর নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইআরজিসি ইসরায়েল এবং মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ৩৪তম দফায় এই আক্রমণ পরিচালনা করে। এই অভিযানে মূলত তিন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং শব্দের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি দ্রুতগতিসম্পন্ন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের এই হামলা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ছিল এবং এতে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
হামলার শিকার হওয়া প্রধান স্থাপনাগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| লক্ষ্যবস্তুর নাম | ধরণ | অবস্থান |
| আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি | মার্কিন সামরিক স্থাপনা | আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত |
| জুফায়ের বিমান ঘাঁটি | মার্কিন নৌ ও সামরিক ঘাঁটি | বাহরাইন |
| রামাত ডেভিড বিমান ঘাঁটি | ইসরায়েলি বিমান বাহিনী কেন্দ্র | উত্তর ইসরায়েল |
| হাইফা বিমানবন্দর | কৌশলগত বেসামরিক বিমানবন্দর | ইসরায়েল |
| গোপন মিসাইল লঞ্চার | ইসরায়েলি সামরিক অবস্থান | তেল আবিবের পূর্বাঞ্চল |
হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রভাব
এই হামলার সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো ইরানের পক্ষ থেকে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি। সাধারণত এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির চেয়ে অন্তত ৫ গুণ বা তার বেশি দ্রুতগতিতে চলতে সক্ষম (প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৬,১৭৪ কিলোমিটার বা তার বেশি)। এর উচ্চগতি এবং বায়ুমণ্ডলে গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতার কারণে প্রচলিত রাডার বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে একে শনাক্ত করা বা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। ইরান দাবি করেছে, তেল আবিবের পূর্বে অবস্থিত ইসরায়েলের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোতে এই হাইপারসনিক অস্ত্র আঘাত হেনেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী (আইডিএফ) ইরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, দেশটির আকাশজুড়ে সাইরেন বেজে ওঠে এবং মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে যে, তাদের শক্তিশালী ‘অ্যারো’ এবং ‘ডেভিড’স স্লিং’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঘাঁটিতে হামলার খবর পাওয়ার পর ওয়াশিংটন থেকে কড়া প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতির ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রাখছে এবং মিত্রদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
আঞ্চলিক অস্থিরতা ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
ইরানের এই হামলাকে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধের উসকানি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। গত কয়েক মাস ধরে গাজা ও লেবানন সীমান্তে চলমান সংঘাতের জের ধরে তেহরান এবং তেল আবিবের মধ্যে উত্তেজনা চরম সীমায় পৌঁছেছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হামলা তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পূর্ববর্তী হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে করা হয়েছে। এই সংঘাত যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
