মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সরাসরি সংঘাতের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক দশকের রেকর্ড ভেঙে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। ১৯৮৩ সালে ফিউচারস বা আগাম লেনদেন শুরু হওয়ার পর থেকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে দামের এমন উল্লম্ফন আর কখনও দেখা যায়নি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ৯৩ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ।
বাজার পরিস্থিতির পরিসংখ্যানিক চিত্র
গত সপ্তাহের পাঁচটি কর্মদিবসে জ্বালানি তেলের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। নিচে তেলের দামের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| তেলের ধরণ | বৃদ্ধির হার (শুক্রবার) | বর্তমান মূল্য (প্রতি ব্যারেল) | সাপ্তাহিক মোট বৃদ্ধি |
| ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল | ৯% + | $৯৩.০০ | প্রায় ২৮% |
| ডব্লিউটিআই ক্রুড | ১২.২১% | $৯০.৯০ | ৩৫.৬৩% |
সংঘাত ও সরবরাহ সংকটের কারণ
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মূলে রয়েছে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’-এর আহ্বানের পর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবির মতে, যদি এই প্রণালিটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়ার উপক্রম হতে পারে। ইতিমধেই ইরাক দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন বন্ধ করেছে এবং কুয়েতও তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।
বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রভাব
জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল আন্তর্জাতিক বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ ভোক্তাদের পকেটেও টান দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের দাম এক সপ্তাহেই ২৭ সেন্ট বেড়ে ৩.২৫ ডলারে পৌঁছেছে। জেপি মরগ্যানের বিশ্লেষক নাতাশা কানেভার মতে, বাজার এখন কেবল যুদ্ধের আশঙ্কা নয়, বরং বাস্তব সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তবে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেলের উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই যুদ্ধ সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধের পরিধি আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরে তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের বিমা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, তবুও বাজারের অস্থিরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
