মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত চীনের সরাসরি সীমান্তে না পৌঁছালেও, এর প্রভাব ইতোমধ্যেই বেইজিংয়ের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় প্রবলভাবে অনুভূত হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে চীনের কাছে কয়েক মাসের তেলের মজুত থাকায় তাত্ক্ষণিক সমস্যা কম, তবে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বা তেলের সরবরাহে অন্তরায় চীনের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
বেইজিংয়ে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের বৈঠক চলছেই। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ভোক্তা ব্যয় সংকোচন, দীর্ঘমেয়াদী সম্পত্তি খাতের সমস্যা, বিপুল স্থানীয় ঋণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস। ১৯৯১ সালের পর প্রথমবারের মতো চীনা সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। তবে উচ্চমানের প্রযুক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দ্রুত উন্নয়ন অব্যাহত আছে।
চীনের রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক চাপ কমানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে বাধাগ্রস্ত। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর সম্ভাব্য বন্ধ অবস্থা চীনের তেলের আমদানিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের ফিলিপ শেটলার-জোন্স মন্তব্য করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা চীনের অন্যান্য বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও বাজারের ওপরও প্রভাব ফেলবে।
চীন ও ইরানের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ বলে মনে হলেও, তা মূলত লেনদেনভিত্তিক। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তেহরান সফর করেন এবং ২০২১ সালে ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং ইরান নিয়মিত তেল সরবরাহ করবে। তবে বাস্তবে বিনিয়োগের বড় অংশ এখনও কার্যকর হয়নি।
নিচের টেবিলে চীনের ইরানি তেল আমদানি ও সংরক্ষণ সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | পরিমাণ/বিস্তারিত | মন্তব্য |
|---|---|---|
| দৈনিক তেল আমদানি (২০২৫) | ১৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল | মোট আমদানির ১২% |
| ভাসমান স্টোরেজ | ৪৬ মিলিয়ন ব্যারেল | এশিয়ার বিভিন্ন বন্দরে |
| স্থল সংরক্ষণ | দালিয়ান ও ঝৌশান | কাস্টমস ছাড়পত্র প্রক্রিয়াধীন |
| অস্ত্র সহায়তা | ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাংশ | চীনের সরাসরি অস্বীকৃতি |
চীন এই সংঘাতে সরাসরি অংশ নিতে চায় না। তবে বেইজিং ইতোমধ্যেই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষ করে সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতাকে লক্ষ্য করে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা।
চীন পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে, বিশেষভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের প্রেক্ষিতে। এই সফর চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বোঝার সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিশেষ করে তাইওয়ান বা অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা বোঝার জন্য চীন এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীন যুদ্ধকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছে এবং নিজেকে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে। অর্থনৈতিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও চীন সামরিকভাবে মিত্রদের রক্ষা করতে সক্ষম নয়, তাই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চাইছে না।
চীনের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো, অস্থির মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করার সঙ্গে বিশ্ববাজারে প্রভাব বজায় রাখা। শি জিনপিং নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে প্রমাণ করতে চাইছেন, যিনি বিশ্বে স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র কখনও কখনও অপ্রত্যাশিতভাবে হস্তক্ষেপ করছে।
