উপদেষ্টাদের দুর্নীতির অভিযোগে চাঞ্চল্য

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতা ছাড়ার পরপরই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়মিত নিয়োগ, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং আর্থিক লেনদেনে অসঙ্গতির মতো গুরুতর বিষয় উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ যাদের ওপর আস্থা রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল, সেই অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই এখন দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড় জমেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্বে থাকার সময় ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে যখন সাবেক সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার গত বছরের আগস্ট মাসে প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, অন্তত আটজন উপদেষ্টার সীমাহীন দুর্নীতির প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। সে সময় অন্তর্বর্তী সরকার অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করলেও বর্তমানে বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে সেই অভিযোগের অনেক দিকই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই কোনো না কোনো অভিযোগ জমা পড়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব অভিযোগ দুদকে জমা পড়ে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা ও এক বিশেষ সহকারীর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন তদন্ত শুরু করেছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, ফাওজুল কবির খান, আসিফ মাহমুদ, আদিলুর রহমান খান এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরীর ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে। দেশের সব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে তাদের অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত লেনদেনের তথ্য পাঠানোর জন্য চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। মূলত অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন বা অর্থ পাচারের কোনো ইঙ্গিত রয়েছে কি না তা যাচাই করাই এই তদন্তের লক্ষ্য।

নিম্নে তদন্তের আওতায় থাকা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নাম ও অভিযোগের ধরন তুলে ধরা হলো—

নামদায়িত্বঅভিযোগের ধরন
ড. মুহাম্মদ ইউনূসসাবেক প্রধান উপদেষ্টাআর্থিক অনিয়ম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানউপদেষ্টাআর্থিক লেনদেন তদন্ত
ফাওজুল কবির খানউপদেষ্টাব্যাংক লেনদেন ও অর্থ পাচারের সন্দেহ
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াস্থানীয় সরকার ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টাপ্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, প্রভাব খাটানো
আদিলুর রহমান খানউপদেষ্টাআর্থিক লেনদেন তদন্ত
খোদা বখস চৌধুরীবিশেষ সহকারীব্যাংক হিসাব তদন্ত

সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে সাবেক স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও যুব-ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে। তার একান্ত সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে এত বেশি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে যে, দায়িত্বে থাকাকালীন সময়েই তাকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হন তিনি। বর্তমানে দুদক ওই এপিএসের বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে।

এছাড়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর নথিতে দেখা গেছে, মোয়াজ্জেম হোসেনের গাড়িচালকের ভাই ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার আয় দেখিয়ে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা তার পেশাগত অবস্থানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছে এনবিআর।

এদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক প্রশাসক এজাজের বিরুদ্ধেও তহবিল তছরুফসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তাকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সুপারিশ ছিল।

অন্যদিকে আরেক সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের সাবেক একান্ত সচিব আতিক মোর্শেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, তিনি প্রভাব খাটিয়ে তার স্ত্রীর মাধ্যমে একটি মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত নিয়োগ ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। একই সঙ্গে টেলিভিশন চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও জমা পড়েছে আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে তদন্ত করা উচিত এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।