টয়োটা বাংলাদেশের এমডিসহ তিন কর্মকর্তার আত্মসমর্পণ ও জামিন

প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষুণ্ন করার গুরুতর অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় টয়োটা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) তিন শীর্ষ কর্মকর্তা আদালতের শরণাপন্ন হয়ে জামিন লাভ করেছেন। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালতে আসামিরা আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানান। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আসামিদের জামিন মঞ্জুর করার আদেশ প্রদান করেন।

জামিনপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পরিচয়

আদালতের আদেশে জামিন প্রাপ্তরা হলেন আন্তর্জাতিক অটোমোবাইল খাতের পরিচিত মুখ এবং টয়োটা বাংলাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। তারা হলেন:

১. প্রেমিত সিং: টয়োটা বাংলাদেশের এমডি (মালয়েশীয় নাগরিক)।

২. আকিও ওগাওয়া: টয়োটা টুশো এশিয়া প্যাসিফিকের ভাইস প্রেসিডেন্ট (জাপানি নাগরিক)।

৩. আসিফ রহমান: টয়োটা টুশো করপোরেশনের জেনারেল ম্যানেজার।

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আসামিরা তাদের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করলে আদালত প্রত্যেকের জন্য ১ হাজার টাকা মুচলেকায় জামিন মঞ্জুর করেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ ভৌমিক এই আদেশের তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।


মামলার প্রেক্ষাপট ও পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন

এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ৯ জুলাই। বাংলাদেশে টয়োটা ব্র্যান্ডের দীর্ঘদিনের একক পরিবেশক (ডিস্ট্রিবিউটর) নাভানা লিমিটেডের পক্ষে শফিউল ইসলাম বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পরিকল্পিতভাবে নাভানা লিমিটেডের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও দীর্ঘদিনের অর্জিত ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন।

আদালতের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক সৈয়দ সাজেদুর রহমান গত ৮ ডিসেম্বর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়।


পিবিআই প্রতিবেদনে উল্লিখিত প্রধান অভিযোগসমূহ

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যেসব সুনির্দিষ্ট কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তা নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

অভিযোগের বিষয়বিস্তারিত বিবরণ
মিথ্যা প্রতিবেদন তৈরিনাভানা লিমিটেডের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট ও ভিত্তিহীন বাজার পরিস্থিতি রিপোর্ট তৈরি করা।
উৎপাদনে বিলম্বগ্রাহকদের অর্ডার করা যানবাহনের উৎপাদন প্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করানো।
নথি সরবরাহ না করাকাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য অপরিহার্য ‘ম্যানুফ্যাকচারার ইনভয়েস’ সরবরাহ বন্ধ রাখা।
আর্থিক ক্ষতিসাধননাভানার স্বাভাবিক আমদানি প্রক্রিয়া ব্যাহত করে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার ঝুঁকিতে ফেলা।
বিশ্বাসভঙ্গব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে নাভানার সাথে সম্পাদিত চুক্তির শর্তাবলি লঙ্ঘন করা।

বর্তমান আইনি পরিস্থিতি ও প্রভাব

এর আগে গত ৮ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে আদালত আসামিদের উপস্থিত হওয়ার জন্য সমন জারি করেছিলেন। সেই সমনের প্রেক্ষিতেই তারা বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হন। মামলার এজাহার অনুযায়ী, নাভানা লিমিটেড দাবি করেছে যে, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ডের ফলে তারা কেবল বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিনই হয়নি, বরং কাস্টমস সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ও বড় অংকের জরিমানার আশঙ্কায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এবং অটোমোবাইল খাতের অন্যতম বড় দুই প্রতিষ্ঠানের এই আইনি লড়াই দেশের অটোমোবাইল বাজারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। টয়োটা টুশো করপোরেশনের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ ও আদালতের সমন জারি হওয়া একটি বিরল ঘটনা। মামলার পরবর্তী ধার্য তারিখে এই প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের বিষয়ে আরও বিস্তারিত শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।