আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ঘরমুখী মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে ২০৭টি যানজটপ্রবণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। গত বছরের তুলনায় এবার যানজটের হটস্পট বা পয়েন্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে এবার সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
Table of Contents
যানজটপ্রবণ এলাকার পরিসংখ্যান ও গত বছরের তুলনা
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ ২০২৬) বিকেলে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই তথ্য জানানো হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। হাইওয়ে পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গত ঈদুল ফিতরে সারা দেশে যানজটপ্রবণ পয়েন্টের সংখ্যা ছিল ১৫৯টি। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে যানজটের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানের সংখ্যা বেড়েছে ৪৮টি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে চলমান উন্নয়ন কাজ, অবৈধ দখলদারিত্ব এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামার কারণে এই পয়েন্টগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। মন্ত্রী জানান, এই ২০৭টি পয়েন্টে ঈদের আগে ও পরে বিশেষ নজরদারি এবং বাড়তি পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
মহাসড়ক ভিত্তিক যানজটপ্রবণ পয়েন্টের তালিকা
নিচে দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে চিহ্নিত করা যানজটপ্রবণ স্থানগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| মহাসড়কের নাম | চিহ্নিত যানজটপ্রবণ স্থানের সংখ্যা | ঝুঁকির মাত্রা |
| ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর | ৫৫ | অত্যন্ত উচ্চ |
| ঢাকা-চট্টগ্রাম | ৪৫ | উচ্চ |
| ঢাকা-সিলেট | ৪৩ | উচ্চ |
| ঢাকা-ময়মনসিংহ | ২১ | মাঝারি |
| ঢাকা-আরিচা | ১৪ | মাঝারি |
| ঢাকা-বরিশাল | ১৪ | মাঝারি |
| ঢাকা-কক্সবাজার | ০৯ | নিম্ন-মাঝারি |
| যশোর-খুলনা | ০৬ | নিম্ন |
ঈদযাত্রার চ্যালেঞ্জ: ২ দিনে ঢাকা ছাড়বে দেড় কোটি মানুষ
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ঈদের ঠিক আগে মাত্র ২ থেকে ৩ দিনের ব্যবধানে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় দেড় কোটি মানুষ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। এত বিশাল সংখ্যক মানুষের যাত্রা সামাল দেওয়া প্রশাসনের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। এই চাপ কমাতে পোশাক কারখানাগুলো একযোগে ছুটি না দিয়ে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
বাড়তি ভাড়া ও রুট পারমিট বাতিলের হুঁশিয়ারি
প্রতি বছর ঈদের সময় পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকাও বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে রুট পারমিট বাতিল করা হবে।” তবে এসি বাসের ভাড়া সরকার নিয়ন্ত্রণ না করায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। ঢাকার পাঁচটি প্রধান টার্মিনালে সিসিটিভি ক্যামেরা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।
চাঁদাবাজি নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য
বৈঠক শেষে মহাসড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে প্রশ্নের সম্মুখীন হলে মন্ত্রী কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, নিবন্ধিত মালিক বা শ্রমিক সমিতি যদি তাদের কল্যাণ তহবিলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে, তবে তাকে চাঁদাবাজি বলা যাবে না। যদিও দেশের প্রচলিত সড়ক পরিবহন আইনে এমন অর্থ সংগ্রহের কোনো বৈধতা নেই। মন্ত্রীর এই বক্তব্য নিয়ে সচেতন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, কারণ পরিবহন খাতের এই ‘অলিখিত চাঁদা’র প্রভাব সরাসরি সাধারণ যাত্রীদের ভাড়ার ওপর পড়ে।
নির্বিঘ্ন যাত্রায় নেওয়া অন্যান্য পদক্ষেপ
টোল প্লাজা: পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলে স্বয়ংক্রিয় টোল বুথ সচল থাকবে যাতে দীর্ঘ সারি তৈরি না হয়।
মেরামত কাজ: মহাসড়কের চলমান সংস্কার কাজ ঈদের এক সপ্তাহ আগেই শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অবৈধ যান: মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা, থ্রি-হুইলার এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
বিআরটিসি: যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে বিআরটিসির বাড়তি বাস প্রস্তুত রাখা হবে।
পরিশেষে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ তৎপরতা এবং যাত্রীদের ধৈর্যের মাধ্যমেই একটি স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সমন্বিত প্রচেষ্টায় এবার যানজট ও দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
