নেতাজিকে বাঁচাতে স্বামী হত্যা নীরা আর্য

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে বহু বীর ও বীরাঙ্গনার অসামান্য অবদান থাকলেও তাঁদের অনেকের নাম সময়ের প্রবাহে আড়ালে পড়ে গেছে। অথচ তাঁদের সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম ইতিহাসকে করেছে মহিমান্বিত। তেমনই এক বিস্ময়কর ও বিরল সাহসিকতার অধিকারী নারী ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের সদস্যা নীরা আর্য। দেশের স্বাধীনতার স্বার্থে তিনি এমন এক কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা ইতিহাসে অনন্য—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন রক্ষার জন্য তিনি নিজের স্বামীকেই হত্যা করেছিলেন।

ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়ে স্বাধীনতার আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। সেই সময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতকে স্বাধীন করার লক্ষ্যে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিল। এই বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল নারীদের নিয়ে গঠিত ‘রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট’। সাহসী ও দৃঢ়চেতা নারীদের এই বাহিনীর অন্যতম সদস্যা ছিলেন নীরা আর্য।

একটি ভয়াবহ মুহূর্তে ঘটে যায় সেই ঐতিহাসিক ঘটনা। ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত এক ভারতীয় কর্মকর্তা শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস নেতাজিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। সুযোগ পেয়ে তিনি নেতাজিকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। তবে সেই গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নেতাজির গাড়ির চালকের গায়ে গিয়ে লাগে। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করেন নীরা আর্য। তিনি বুঝতে পারেন যে নেতাজির জীবন মারাত্মক বিপদের মুখে পড়েছে। কোনো দ্বিধা না করে তিনি সঙ্গে থাকা অস্ত্র দিয়ে আক্রমণকারীকে হত্যা করেন।

পরবর্তীতে জানা যায়, যাকে তিনি হত্যা করেছেন সেই ব্যক্তি তাঁর নিজের স্বামী শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস। দেশপ্রেমের কাছে ব্যক্তিগত সম্পর্ক যে কত ক্ষুদ্র হয়ে যেতে পারে, নীরা আর্যের এই ঘটনাটি তার এক বিরল দৃষ্টান্ত। নেতাজি এই ঘটনার পর গভীর আবেগে নীরা আর্যকে ‘নাগিনী’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

নীরা আর্যের জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ এবং দৃঢ় আদর্শে ভরপুর। তাঁর জন্ম ও ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো।

বিষয়তথ্য
জন্মতারিখ৫ মার্চ ১৯০২
জন্মস্থানখেকড়া শহর, বাগপত জেলা, উত্তর প্রদেশ
পিতাশেঠ ছজুমল, একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী
শিক্ষাজীবনপ্রধানত কলকাতায় অতিবাহিত
সংগঠনআজাদ হিন্দ ফৌজ
সামরিক শাখারানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট
ভূমিকাযোদ্ধা ও গুপ্ত তথ্য সংগ্রাহক

শৈশব থেকেই নীরা আর্যের মধ্যে দেশপ্রেমের গভীর বোধ গড়ে ওঠে। শিক্ষিত ও মেধাবী এই নারী স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দেন। তিনি শুধু যোদ্ধা হিসেবেই নয়, গুপ্ত তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। ব্রিটিশ বাহিনীর বিভিন্ন গোপন তথ্য সংগ্রহ করে তিনি নেতাজির কাছে পৌঁছে দিতেন, যা স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিকল্পনায় বিশেষ সহায়ক ছিল।

কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল এক গভীর দ্বন্দ্বের গল্প। তাঁর স্বামী শ্রীকান্ত জয়রঞ্জন দাস ছিলেন ব্রিটিশ শাসনের অনুগত কর্মকর্তা। ফলে তাঁদের আদর্শ ও বিশ্বাসের মধ্যে ছিল বিস্তর পার্থক্য। একদিকে স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গে প্রস্তুত এক দেশপ্রেমিক নারী, অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুগত একজন কর্মকর্তা—এই দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

স্বামী হত্যার ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকার নীরা আর্যকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে দ্বীপান্তরের দণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে তাঁর ওপর চলে অকথ্য নির্যাতন ও অমানবিক অত্যাচার। তবুও তিনি কখনো নিজের আদর্শ বা সহযোদ্ধাদের সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। কিন্তু স্বাধীন দেশের সমাজ তাঁর প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা দিতে পারেনি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁকে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। জীবিকা নির্বাহের জন্য তাঁকে ফুল বিক্রি করেও জীবনধারণ করতে হয়েছে।

অবশেষে ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় এই সাহসী নারী পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। যদিও তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ ও বীরত্বের এক অনন্য উদাহরণ, তবুও ইতিহাসে তাঁর প্রাপ্য সম্মান অনেকটাই অপ্রাপ্ত থেকে গেছে।

আজও লোকগাথা, লোকসংগীত এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিতে ‘নীরা নাগিনী’ সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—দেশের স্বাধীনতার জন্য সত্যিকারের দেশপ্রেমিকেরা ব্যক্তিগত সুখ, সম্পর্ক এবং স্বার্থ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাস রচনা করতে পারেন।