মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ও ইরানের পাল্টা প্রতিহামলার কারণে শ্রমবাজার ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে আকাশপথ বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল এবং ভিসা জটিলতা তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীরা মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। ইতিমধ্যে আরব আমিরাত ও বাহরাইনে দুইজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন, আরও সাতজন আহত হয়েছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে। এই অঞ্চল থেকে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে।
বাতিল ফ্লাইটের পরিসংখ্যান (২৮ ফেব্রুয়ারি – ৪ মার্চ)
| তারিখ | বাতিল ফ্লাইট সংখ্যা | প্রধান এয়ারলাইনগুলোর পরিমাণ |
|---|---|---|
| ২৮ ফেব্রুয়ারি | ২৩ | বিভিন্ন এয়ারলাইন |
| ১ মার্চ | ৪০ | বিভিন্ন এয়ারলাইন |
| ২ মার্চ | ৪৬ | বিভিন্ন এয়ারলাইন |
| ৩ মার্চ | ৩৯ | বিভিন্ন এয়ারলাইন |
| ৪ মার্চ | ২৫ | বিভিন্ন এয়ারলাইন |
| মোট | ১৭৩ |
চলমান সংঘাতের কারণে নতুন প্রবাসীরা নির্ধারিত সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে পারছেন না; আবার ছুটি শেষে কাজে ফেরার কথা থাকলেও অনেকেই দেশে আটকে পড়েছেন। বিমানবন্দরে অনিশ্চয়তায় অপেক্ষা করছেন বহু প্রবাসী। কাতার ইতিমধ্যে এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ এক মাস বৃদ্ধি করেছে। অন্যান্য দেশও ভিসা মেয়াদ বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জিসিসি-ভুক্ত দেশগুলিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা নিম্নরূপ:
| দেশ | প্রবাসী কর্মী (সংখ্যা) |
|---|---|
| সৌদি আরব | ২০ লাখ |
| সংযুক্ত আরব আমিরাত | ১০ লাখ |
| ওমান | ৭ লাখ |
| কাতার | ৪ লাখ ৫০ হাজার |
| বাহরাইন | ১ লাখ ৫০ হাজার |
| কুয়েত | ১ লাখ ৪০ হাজার |
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে মোট প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে জিসিসি দেশগুলো থেকে এসেছে ৩৪৪ কোটি টাকা (৪৫.৪০ শতাংশ)। বিশেষ করে রমজান মাসে এই আয় সবচেয়ে বেশি আসে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ দেশ থেকে স্থানান্তর এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স। এই অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব এবং প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে।
সরকার ইতিমধ্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে, যেটি আটকে পড়া প্রবাসীদের ভিসা ও ফ্লাইট সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করছে। প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মনিটর করছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিমান কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা আরও গভীর হচ্ছে, যা দ্রুত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।
