আয়ান মৃত্যুকাণ্ডে দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন স্থগিত

রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে সুন্নতে খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)। চিকিৎসা পেশায় দায়িত্ব ও পেশাগত আচরণ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিবন্ধন স্থগিত হওয়া দুই চিকিৎসক হলেন ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ ও ডা. তাসনুভা মাহজাবীন।

বিএমডিসির ৫৪তম কাউন্সিল সভায় দীর্ঘ শুনানি ও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএমডিসির রেজিস্ট্রার ডা. লিয়াকত হোসেন। তিনি জানান, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছয় মাসের জন্য দুই চিকিৎসকের নিবন্ধন সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা দেশের কোথাও চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন না এবং নিজেদের চিকিৎসক পরিচয়ও ব্যবহার করতে পারবেন না।

বিএমডিসির প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শিশু আয়ান আহমেদের সুন্নতে খতনার সময় অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ সংক্রান্ত চিকিৎসাকাজে আনা অভিযোগের দায় প্রমাণিত হওয়ায় ডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল আইন, ২০১০–এর ধারা ২৩(১) এবং বিএমডিসি প্রবিধানমালা ২০২২–এর বিধান ৩৬(৪)(খ) অনুযায়ী তার নিবন্ধন ছয় মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

অন্যদিকে অস্ত্রোপচার পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. তাসনুভা মাহজাবীনের বিরুদ্ধে সরাসরি চিকিৎসাগত অবহেলার প্রমাণ না পাওয়া গেলেও পেশাসুলভ আচরণের ঘাটতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ফলে একই মেয়াদের জন্য তার নিবন্ধনও স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএমডিসি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বিএমডিসি আইনের ধারা ২২(১) অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দুই চিকিৎসক বাংলাদেশে কোনো ধরনের এলোপ্যাথি চিকিৎসা প্রদান করতে পারবেন না। পাশাপাশি চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া থেকেও তারা বিরত থাকতে বাধ্য থাকবেন। এই নিষেধাজ্ঞা ৩ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ওই দিন রাজধানীর বাড্ডার সাঁতারকুল এলাকার ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সুন্নতে খতনার জন্য শিশু আয়ানকে নিয়ে যান তার বাবা শামীম আহমেদ। নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী খতনার আগে আয়ানকে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই সে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে।

কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও আয়ানের জ্ঞান ফেরেনি। চার দিন পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে একই প্রতিষ্ঠানের গুলশান-২ এলাকায় অবস্থিত ইউনাইটেড হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (পিআইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২০ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সে সময় জানিয়েছিল, ফুসফুসে বাতাস জমে যাওয়ার কারণে আয়ানের কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। পরবর্তী সময়ে তার শরীরে হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি ও লিভারসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ঘটনাটি গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার মান ও নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়। এর প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পাশাপাশি আয়ানের পরিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং বিএমডিসির কাছে বিচার চেয়ে আবেদন করে। পরে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগকারী ও অস্ত্রোপচার পরিচালনাকারী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।

দীর্ঘ তদন্ত ও শুনানি শেষে বিএমডিসি দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করল।

নিচে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—

বিষয়তথ্য
শিশুর নামআয়ান আহমেদ
ঘটনার তারিখ৩০ ডিসেম্বর ২০২৩
খতনা সম্পন্নের স্থানরাজধানীর একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
মৃত্যুর সময়৩১ ডিসেম্বর রাত ১১টা ২০ মিনিট
অভিযুক্ত চিকিৎসকডা. সৈয়দ সাব্বির আহমেদ, ডা. তাসনুভা মাহজাবীন
সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানবাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল
শাস্তির ধরননিবন্ধন স্থগিত
শাস্তির মেয়াদ৬ মাস
কার্যকর তারিখ৩ মার্চ

এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসা পেশায় জবাবদিহিতা ও পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ শাস্তি অপরিহার্য।