শ্রেয়া ঘোষাল কি তবে গানে ইতি টানলেন? না কি নতুন মোড়?

ভারতীয় সংগীত জগতের মেলোডি কুইন বা সুকণ্ঠী গায়িকা হিসেবে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি হলেন শ্রেয়া ঘোষাল। ‘মেরে ঢোলনা’ থেকে ‘চিকনি চামেলি’—তার কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকেন কোটি কোটি অনুরাগী। কিন্তু সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই শিল্পী এমন কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, যা তার ভবিষ্যৎ সংগীত ক্যারিয়ার এবং গান বাছাইয়ের ধরণ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অরিজিৎ সিংয়ের প্লেব্যাক থেকে সরে দাঁড়ানোর জল্পনার পর শ্রেয়ার এই ঘোষণা ভক্তমহলে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।

গান বাছাইয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

শ্রেয়া ঘোষাল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তিনি গান গাওয়া ছাড়ছেন না, তবে নির্দিষ্ট ঘরানার গানে ইতি টানতে চলেছেন। বিশেষ করে ‘চিকনি চামেলি’-র মতো তথাকথিত ‘আইটেম সং’ বা যে গানের কথায় নারীদের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তেমন গান তিনি আর ভবিষ্যতে রেকর্ড করবেন না। যদিও এক সময় এই গানটি গেয়ে তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন এবং ক্যাটরিনা কাইফের অনবদ্য নাচ গানটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শ্রেয়ার চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এসেছে।

গানের গীতি বা লিরিকস নিয়ে শ্রেয়া এখন অনেক বেশি সচেতন। তিনি জানান, ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেক সময় পঙ্‌ক্তির গভীর অর্থ বা সামাজিক প্রভাব না বুঝেই অনেক গান গেয়েছেন। কিন্তু এখন তিনি মনে করেন, শিল্পীর দায়বদ্ধতা রয়েছে সমাজের প্রতি। একটি সাক্ষাৎকারে তিনি মজার ছলে অথচ গুরুত্বের সাথে জানান, তার এক গীতিকার বন্ধু তাকে এমন এক গানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন যেখানে লাইন ছিল— ‘আমাকে চিকেন বানিয়ে খেয়ে নাও’। এমন রুচিহীন এবং নারীদের ‘অবজেক্টিফাই’ করা গান তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।


শ্রেয়া ঘোষালের ক্যারিয়ার ও সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট

বিষয়বিবরণ ও মন্তব্য
সিদ্ধান্তের মূল কেন্দ্র‘আইটেম সং’ বা দ্ব্যর্থবোধক লিরিকসের গান বর্জন।
অনুপ্রেরণা বা কারণসামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত রুচিবোধের পরিবর্তন।
অস্বস্তির জায়গাস্টেজ শো-তে শিশুদের সামনে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী গান গাইতে অনীহা।
জনপ্রিয় গান বনাম বর্তমান অবস্থান‘চিকনি চামেলি’ জনপ্রিয় হলেও ভবিষ্যতে এমন গান আর রেকর্ড করবেন না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাপ্লেব্যাক এবং ধ্রুপদী ঘরানার গানে নিয়মিত থাকা।

মঞ্চ পরিবেশনা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা

শ্রেয়া ঘোষালের এই সিদ্ধান্তের পেছনে একটি বড় কারণ হলো মঞ্চে পারফরম্যান্স বা লাইভ কনসার্ট। তিনি লক্ষ্য করেছেন, যখন কোনো গান হিট হয়, তখন দর্শকরা মঞ্চে সেই গানটি শোনার দাবি জানান। কিন্তু গানের কথায় যদি আপত্তিকর ইঙ্গিত থাকে, তবে সামনে বসে থাকা শিশুদের উপস্থিতিতে সেই গান গাইতে তিনি প্রচণ্ড অস্বস্তি বোধ করেন। শ্রেয়ার মতে, “গানটা ভালো লাগা এক বিষয়, কিন্তু তার সামাজিক বার্তা বা স্থায়িত্ব অন্য বিষয়। আমি চাই না আমার গাওয়া কোনো গান কাউকে বা কোনো লিঙ্গকে ছোট করুক।”

উপসংহার

শ্রেয়া ঘোষাল গানে ইতি টানছেন না, বরং তিনি তার সংগীতকে আরও মার্জিত এবং অর্থবহ করতে চাইছেন। তথাকথিত বাণিজ্যিক চাহিদাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একজন শিল্পী যখন সুস্থ সংস্কৃতির পক্ষে কথা বলেন, তখন তা সংগীতাঙ্গনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার এই সাহসী পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, খ্যাতির চেয়ে শিল্পীর আত্মসম্মান এবং আদর্শ অনেক বেশি মূল্যবান। শ্রেয়ার অনুরাগীগণ তার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং তারা আশা করছেন, আগামীর দিনগুলোতে শ্রেয়ার কণ্ঠে আরও উন্নত মানের ধ্রুপদী ও রোমান্টিক গান উপহার পাবেন।