,

ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার লড়াই: কতদিন চলবে এই অসম প্রতিযোগিতা?

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনীতি এক চরম উত্তেজনার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যা বর্তমানে কেবল সামরিক শক্তির লড়াই নয় বরং উন্নত প্রযুক্তির এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। একদিকে ইরানের ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রের আক্রমণ, অন্যদিকে সেগুলোকে আকাশে থাকতেই ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এই সংঘাতকে সমর বিশেষজ্ঞরা অভিহিত করছেন ‘তীর ও ধনুকের’ লড়াই হিসেবে। যেখানে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র আগে ফুরাবে, নাকি প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টর?

অস্ত্রভাণ্ডারের প্রতিযোগিতা ও রণকৌশল

বার্তা সংস্থা এএফপি এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণ সংস্থা ‘মিন্টেল ওয়ার্ল্ড’-এর তথ্য অনুযায়ী, চলমান যুদ্ধের প্রথম দুই দিনেই ইরান সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানের দিক লক্ষ্য করে প্রায় ৪০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং এক হাজারেরও বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এই বিশাল পরিমাণ আক্রমণের মুখে পশ্চিমা শক্তিগুলো বর্তমানে তাদের ‘ইন্টারসেপ্টর’ বা প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে চিন্তিত।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ স্কট বেনেডিক্ট এই পরিস্থিতিকে দুই তীরন্দাজের লড়াইয়ের সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, এটি আসলে কার অস্ত্রভাণ্ডার কত বেশি সমৃদ্ধ এবং কার উৎপাদন ক্ষমতা কত দ্রুত, তার এক অসম প্রতিযোগিতা।

আকাশ প্রতিরক্ষা ও উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘সীমাহীন’ বলে দাবি করলেও সামরিক বিশেষজ্ঞরা বাস্তবের চিত্রটি ভিন্নভাবে তুলে ধরেছেন। ফ্রান্সভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ’-এর তথ্যমতে, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে শতভাগ নিশ্চিতভাবে ধ্বংস করতে অন্তত দুটি ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হয়। অথচ এই প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতা ও উৎপাদন চিত্র:

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধরণবার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতাগত বছরের যুদ্ধে ব্যবহার (১২ দিনে)মূল সীমাবদ্ধতা
থাড (THAAD)৯৬টি মিসাইলপ্রায় ১৫০টিউৎপাদন অত্যন্ত ধীর এবং ব্যয়বহুল।
প্যাট্রিয়ট (Patriot)প্রায় ৬০০টি ইন্টারসেপ্টরউল্লেখযোগ্য সংখ্যকমজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রপ্রতি মাসে শত শত (প্রাক্কলিত)৪৫০+ (শুরুর ২ দিনে)লঞ্চার ধ্বংস হলে উৎক্ষেপণ বাধাগ্রস্ত হয়।

‘তীর বনাম তীরন্দাজ’ কৌশল

বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। তারা কেবল ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘তীর’ ধ্বংস না করে, সেগুলো যেখান থেকে ছোঁড়া হচ্ছে অর্থাৎ সেই ‘তীরন্দাজ’ বা উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (লঞ্চার) ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের মতে, উৎক্ষেপণ যন্ত্র ধ্বংস করতে পারলে ইরানের আক্রমণের তীব্রতা স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। যদিও ইরানের হাতে কয়েকশ থেকে দুই হাজার পর্যন্ত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর অধিকাংশেরই লঞ্চার এখন মিত্রবাহিনীর লক্ষ্যবস্তু।

দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব ও ঝুঁকি

গবেষক এতিয়েন মারকুজ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—ইরানের সাম্প্রতিক আক্রমণের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণ কি তাদের সক্ষমতা হ্রাস, নাকি তারা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য রসদ জমাচ্ছে? আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কখনোই একশ ভাগ নিশ্ছিদ্র নয়। যদি ইরান হুতি বিদ্রোহীদের মতো দীর্ঘ সময় ধরে কম মাত্রার কিন্তু নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে যায়, তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা চরম চাপের মুখে পড়বে।

পরিশেষে, এই সংঘাত কেবল সামরিক শক্তিতে মীমাংসা হওয়া কঠিন। একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান না এলে এই ক্ষেপণাস্ত্র বনাম প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।