নির্বাচিত সরকারের প্রত্যাশা পূরণে দুদক চেয়ারম্যানের পদত্যাগ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। কোনো বিশেষ মহলের চাপে নয়, বরং নবনির্বাচিত সরকারের আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যেই সপদে ইস্তফা দিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে তিনি তার আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই দিনে কমিশনের অপর দুই কমিশনারও তাদের পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন।

পদত্যাগের প্রেক্ষাপট ও কারণ

গত ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার গঠন হওয়ার ১৪তম দিনে এই সিদ্ধান্ত নিলেন দুদক চেয়ারম্যান। পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ড. মোমেন বলেন, “নতুন নির্বাচিত সরকারের কিছু সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও প্রত্যাশা থাকে। সেই প্রত্যাশা পূরণে সহযোগী হিসেবে আমরা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছি। এর পেছনে কোনো লুকানো কারণ বা বাহ্যিক চাপ ছিল না।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত সরকার হয়তো আরও দক্ষ বা যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে কমিশন পুনর্গঠন করতে চায়। রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে এই পরিবর্তন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। কমিশনের কার্যকরিতা বা ‘নখ-দাঁত’ থাকা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বিনয়ের সাথে বলেন, “আমাদের সময়ে আমরা কতটা সফল ছিলাম বা আমাদের সক্ষমতা কেমন ছিল, সেটি বিচারের ভার দেশবাসী ও সংবাদমাধ্যমের ওপর ছেড়ে দিচ্ছি।”

বিদায়ি কমিশনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও মেয়াদকাল

ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর ৫ বছর মেয়াদে দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তার আগে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নিচে বিদায়ি কমিশনের সদস্যদের তালিকা ও তাদের দায়িত্ব গ্রহণের তথ্য দেওয়া হলো:

নামপদবিদায়িত্ব গ্রহণের তারিখপূর্বতন পেশাগত পরিচয়
ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনচেয়ারম্যান১০ ডিসেম্বর ২০২৪সচিব, জননিরাপত্তা বিভাগ
মিঞা মুহাম্মদ আলী আকবার আজিজীকমিশনার১১ ডিসেম্বর ২০২৪সাবেক জ্যেষ্ঠ আমলা
ব্রি. জে. (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদকমিশনার১৫ ডিসেম্বর ২০২৪অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

কমিশনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

দুদক একটি সাংবিধানিক এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হলেও বিভিন্ন সময়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। ড. মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময় (তিন মাসেরও কম) দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছে। এই অল্প সময়ে তারা মূলত প্রশাসনিক সংস্কার এবং বকেয়া ফাইলগুলো পুনর্মূল্যায়নের কাজ শুরু করেছিলেন।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুদকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে বড় বড় দুর্নীতির মামলাগুলোর সুরাহা করা। নির্বাচিত সরকার এখন নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে কমিশনকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ পাবে। জনমতের প্রত্যাশা অনুযায়ী, নতুন কমিশন যেন সত্যিকার অর্থেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়।

ড. মোমেন তার বক্তব্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পরিবর্তনের এই ধারায় আরও যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের হাতে দুদক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তার এই মার্জিত বিদায় দেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।