বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারিক রমাদানের বিরুদ্ধে ফ্রান্সে দায়ের করা একাধিক ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। সোমবার (২ মার্চ) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি আদালতে এই আলোচিত মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। ৬৩ বছর বয়সী এই সুইস বংশোদ্ভূত গবেষকের বিরুদ্ধে মোট তিন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছে। যদি আদালতে এই অভিযোগসমূহ প্রমাণিত হয়, তবে তাকে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হতে পারে।
Table of Contents
অভিযোগের প্রেক্ষাপট ও দীর্ঘ তদন্ত
তারিক রমাদানের বিরুদ্ধে আনীত এই আইনি লড়াইকে ফ্রান্সে ‘হ্যাশট্যাগ মি-টু’ (#MeToo) আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রসিকিউটরদের দাবি, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে তিনি এই তিন নারীকে যৌন নিপিড়ন ও ধর্ষণ করেছেন। যদিও শুরু থেকেই রমাদান এসব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দিয়ে নিজের নির্দোষিতার দাবি করে আসছেন।
নিচে তারিক রমাদানের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগকারীদের দাবি ও ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| অভিযোগকারীর পরিচয় | ঘটনার সময়কাল | স্থান ও অভিযোগের বিবরণ |
| হেনদা আয়াড়ি (৪১) | ২০১২ সালের বসন্ত | প্যারিসের একটি হোটেলে সম্মেলন চলাকালে ধর্ষণ ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। |
| ‘ক্রিস্টেল’ (ছদ্মনাম) | ২০০৯ সালের অক্টোবর | লিয়ন শহরের একটি হোটেলে সম্মেলন চলাকালে সহিংস ধর্ষণ ও আক্রমণ। |
| তৃতীয় নারী | ২০১৬ সাল | অজ্ঞাত স্থানে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ। |
অধ্যাপক থেকে অভিযুক্ত: এক পতনশীল ক্যারিয়ার
তারিক রমাদান একসময় সমকালীন ইসলামি দর্শনের জগতে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কনটেম্পোরারি ইসলামিক স্টাডিজ’ বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং একসময় যুক্তরাজ্য সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। ২০১৭ সালে প্রথম যখন তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠায়। পরবর্তীতে আইনি জটিলতা বৃদ্ধি পেলে ২০২১ সালে তিনি অধ্যাপক পদ থেকে আগাম অবসর গ্রহণ করেন।
তদন্তের শুরুতে রমাদান কোনো ধরনের যৌন সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেছিলেন। তবে ২০১৮ সালে তদন্তকারী বিচারকদের সামনে তিনি স্বীকার করেন যে, অভিযোগকারী প্রথম দুই নারীর সঙ্গে তার যৌন সম্পর্ক ছিল, তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ‘পারস্পরিক সম্মতিতে’। তার এই বয়ান পরিবর্তন মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
শারীরিক অবস্থা ও আইনি জটিলতা
রমাদানের আইনজীবীরা সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে জানিয়েছেন যে, তাদের মক্কেল বর্তমানে একাধিক দীর্ঘমেয়াদী রোগে আক্রান্ত। তারা দাবি করেছেন, রমাদানের বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় উপস্থিত থাকার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে, অভিযোগকারী ‘ক্রিস্টেল’-এর আইনজীবীরা আদালতের কাছে অনুরোধ জানাবেন যেন বিচারকার্যটি জনসাধারণের উপস্থিতি ছাড়াই গোপন কক্ষে পরিচালনা করা হয়, যাতে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও সুইজারল্যান্ডের রায়
উল্লেখ্য যে, ফ্রান্সে বিচার শুরুর আগেই ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ডের একটি আপিল আদালত ২০০৮ সালে জেনেভায় সংঘটিত একটি পৃথক ধর্ষণ মামলায় রমাদানকে দোষী সাব্যস্ত করে তিন বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন। দেশটির সর্বোচ্চ আদালতও সেই রায় বহাল রাখে। তবে রমাদানের সুইস আইনি দল এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে বিষয়টি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
প্যারিসের এই বিচার প্রক্রিয়ার ওপর এখন বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী এবং ইসলামি চিন্তাবিদদের নজর রয়েছে। এটি কেবল একজন ব্যক্তির বিচার নয়, বরং সম্মতির সংজ্ঞা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে ফরাসি বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
