ভারত ও কানাডার ঐতিহাসিক পারমাণবিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি

দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন স্বর্ণযুগে পদার্পণ করেছে ভারত ও কানাডা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক ফলপ্রসূ বৈঠকের পর আগামী ১০ বছরের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ চুক্তিসহ একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির এই বৈঠকটি কেবল একটি বাণিজ্যিক মিলনমেলা নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক বিশেষ সমীকরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে নতুন দিগন্ত

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী মোদী জানান, বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহের জন্য একটি ‘মাইলফলক’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে ভারতের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ কানাডা থেকে মেটানো সম্ভব হবে। শুধু জ্বালানি আমদানিই নয়, দুই দেশ যৌথভাবে ক্ষুদ্র মডুলার রিয়্যাক্টর (SMR) এবং উন্নত রিয়্যাক্টর প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। মোদী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতে দুই দেশকে ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে অভিহিত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সুপারকম্পিউটিং এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে গভীরতর সহযোগিতার ওপর জোর দেন।

অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রা

দুই দেশের নেতারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। এ লক্ষ্যে বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা ‘বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ বা CEPA ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান শুল্ক নীতির প্রভাব হ্রাস করা এবং নিজেদের বাণিজ্য বাজার বহুমুখীকরণ করাই উভয় দেশের এই সমঝোতার মূল উদ্দেশ্য।

নিচে বৈঠকে আলোচিত প্রধান সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহ সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:

সহযোগিতার খাতমূল লক্ষ্য ও চুক্তির ধরনসময়সীমা/লক্ষ্যমাত্রা
পারমাণবিক শক্তি১০ বছর মেয়াদি ইউরেনিয়াম সরবরাহ চুক্তি২০২৬-২০৩৬
প্রযুক্তিAI, সেমিকন্ডাক্টর ও সুপারকম্পিউটিং উন্নয়নদীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব
বাণিজ্য (CEPA)মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তকরণ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ
অর্থনীতিদ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি৫০ বিলিয়ন ডলার
জ্বালানিনবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্মেলন আয়োজনআসন্ন বছর

সম্পর্কের তিক্ততা কাটিয়ে উত্তরণ

২০২৩ সালে শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাস্টিন ট্রুডোর সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটেছিল। সেই সময়ে পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কার এবং ভিসা সেবা স্থগিতের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে মার্ক কার্নি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এই কূটনৈতিক জট খুলতে শুরু করে। কার্নি প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কানাডার মাটিতে কোনো সহিংস ঘটনার সঙ্গে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ তাদের হাতে নেই। এই ইতিবাচক অবস্থানের মাধ্যমেই দুই দেশ পুনরায় ‘ভবিষ্যতমুখী অংশীদারত্ব’ গড়তে সক্ষম হয়েছে।

আঞ্চলিক প্রভাব ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

মার্ক কার্নির এই দিল্লি সফর কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চার দিনের সফরের শুরুতে মুম্বাইয়ের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করেছেন এবং দিল্লি সফর শেষে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। এটি মূলত কানাডার ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’-র একটি অংশ, যার মাধ্যমে দেশটি এশিয়ায় তার বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের পরিধি বাড়াতে আগ্রহী। ভারতের জন্য এই চুক্তিটি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।