ইরানের রাজধানী তেহরানসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে আকস্মিক ও সমন্বিত সামরিক হামলার ঘটনায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হামলাটি যৌথভাবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র পরিচালনা করেছে—এমন অভিযোগও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন এক অনিশ্চয়তার সূচনা করেছে।
মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স–এর পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ হামলার পেছনে সৌদি আরবের পরোক্ষ সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ইসরায়েল ও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সেই অভিন্ন কৌশলগত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রভাবিত করেছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
রয়টার্সের বরাতে জানা যায়, হামলার কিছুক্ষণ আগে আয়াতুল্লাহ খামেনি নিরাপদ স্থানে তার দুই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা—আলি লারিজানি এবং আলি শামখানি–এর সঙ্গে বৈঠকে ছিলেন। ঠিক সেই সময় লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই খামেনির মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত বিবৃতি তৎক্ষণাৎ প্রকাশ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রকাশ্যে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিলেও, যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনায় ভিন্ন বার্তা দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে তিনি নাকি সতর্ক করে বলেন, ইরানের প্রভাব ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে এবং তা প্রতিহত করতে দৃঢ় সামরিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
একই সময়ে যুবরাজের ভাই খালিদ বিন সালমান যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অনুরূপ অবস্থান তুলে ধরেন বলে জানা গেছে। সৌদি নেতৃত্ব ইরানকে তাদের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে—এ তথ্যও প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেন, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘদিনের।
সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান
| পক্ষ | প্রকাশ্য অবস্থান | কূটনৈতিক বার্তা |
|---|---|---|
| সৌদি আরব | ইরানে হামলার বিরোধিতা, আকাশসীমা ব্যবহার না করার ঘোষণা | ইরানের প্রভাব ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপের পক্ষে মত |
| ইসরায়েল | ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান | সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপের প্রচেষ্টা |
| যুক্তরাষ্ট্র | আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষার অঙ্গীকার | সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা |
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের বিশ্লেষণে সৌদি আরব ও ইসরায়েলকে “মধ্যপ্রাচ্যের অস্বাভাবিক মার্কিন মিত্র জুটি” হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থ ইরানবিরোধী অবস্থানে একত্রিত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
এদিকে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানে সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত সামরিক অভিযান চলবে। এই ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সতর্কাবস্থা জারি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামোতেই পরিবর্তন আনবে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, যদি এ অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তবে সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক সমন্বয় ভবিষ্যতে নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের পথ সুগম করতে পারে। একই সঙ্গে এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতারও কারণ হতে পারে। ফলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।