মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম উত্তেজনার দিকে মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ঘোষণা করেছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সকল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তারা অত্যন্ত শক্তিশালী ও নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই অভিযান কেবল শুরু এবং শত্রুরা চূড়ান্তভাবে পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত এই আক্রমণ অব্যাহত থাকবে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও ইরানি প্রতিরক্ষা নীতি
ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রতিক্রিয়ায় এই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি। তাদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ সামরিক অপারেশন নয়, বরং সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি কঠোর পদক্ষেপ। ইরানের সামরিক কমান্ড সতর্ক করে দিয়েছে যে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সকল সম্পদ ও স্থাপনা এখন থেকে ইরানি বাহিনীর জন্য ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচিত হবে। আইআরজিসির বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের দোহাই দিয়ে বলা হয়েছে যে, কোনো দেশ যদি ইরানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, তবে তেহরান তার আত্মরক্ষার বৈধ অধিকার প্রয়োগ করবে।
হামলার বিস্তৃতি ও লক্ষ্যবস্তুসমূহ
শনিবার ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা ‘ফারস নিউজ’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত হাফ ডজন দেশে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি ঘাঁটিতে সুসংহত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হামলার ভয়াবহতা ও বিস্তৃতি ছিল নজিরবিহীন। কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন কৌশলগত ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
নিচে হামলার শিকার হওয়া প্রধান প্রধান স্থাপনা ও স্থানের তালিকা দেওয়া হলো:
| লক্ষ্যবস্তু বা স্থাপনার নাম | দেশ | বর্তমান পরিস্থিতি ও ক্ষয়ক্ষতি |
| আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি | কাতার | মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ঘাঁটি; ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা। |
| আল-সালেম বিমান ঘাঁটি | কুয়েত | ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে; অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। |
| আল-ধাফরা বিমান ঘাঁটি | সংযুক্ত আরব আমিরাত | ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তিশালী আঘাতের শিকার। |
| মার্কিন পঞ্চম নৌবহর সদরদপ্তর | বাহরাইন | কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টারে হামলার খবর। |
| রিয়াদ (রাজধানী) | সৌদি আরব | বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে; এএফপি নিশ্চিত করেছে। |
| আবু ধাবি ও জর্ডান | আমিরাত ও জর্ডান | আবু ধাবিতে একজন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে আল জাজিরা। |
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
এই নজিরবিহীন হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক ভয়াবহ অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপি এবং কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে কেবল সামরিক অবকাঠামো নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও চরম হুমকির মুখে পড়েছে। আবু ধাবিতে বেসামরিক জানমালের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক কঠোর বিবৃতিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তথাকথিত ‘ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর’ সামরিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা এই আগ্রাসনকে বিশ্বশান্তির জন্য হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি তার কৌশলগত অবস্থান থেকে পিছু না হটে এবং হামলা চালিয়ে যায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব এই হামলার পাল্টা জবাব কীভাবে দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে বিশ্ব সম্প্রদায়।
