পৃথিবী আজ যে রূপে মানব ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য বাসযোগ্য, ভবিষ্যতে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে—এমনই এক উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক এক জলবায়ু সিমুলেশন গবেষণায় দেখা গেছে, আজ থেকে প্রায় ২৫ কোটি বছর পর পৃথিবীর সব মহাদেশ একত্রিত হয়ে একটি বিশাল সুপারকন্টিনেন্ট বা মহাভূখণ্ডে পরিণত হতে পারে। এই পরিবর্তন শুধু ভৌগোলিক বিন্যাসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা পৃথিবীর জলবায়ু, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।
যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী “নেচার”-এ প্রকাশিত হয়েছে। এতে ভবিষ্যতের পৃথিবীর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশেষ করে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য অত্যন্ত ভীতিকর। গবেষকদের মতে, তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং শুষ্ক পরিবেশ প্রাণিকুলের বসবাসযোগ্য অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করে ফেলবে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, টেকটোনিক প্লেটের ধীরগতির নড়াচড়ার ফলে আটলান্টিক মহাসাগর ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে একসময় বিলীন হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের সংঘর্ষ ঘটবে, যার ফলে বর্তমানের ভূমধ্যসাগর সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে যাবে। এর ফলে মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়া সরাসরি ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি বিশাল নিরবচ্ছিন্ন স্থলভাগ তৈরি করবে।
সমুদ্রের অনুপস্থিতি পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। ফলে ফ্রান্সসহ বহু অঞ্চল তাদের প্রাকৃতিক শীতলতা হারাবে এবং গ্রীষ্মকাল হয়ে উঠবে অত্যন্ত তীব্র ও অসহনীয়। গবেষকদের কম্পিউটার মডেল অনুযায়ী, সুপারকন্টিনেন্টের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে বছরের দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি থাকবে।
নিচে সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো—
| বিষয় | সম্ভাব্য অবস্থা |
|---|---|
| মহাদেশের বিন্যাস | একীভূত সুপারকন্টিনেন্ট |
| প্রধান সমুদ্র | আটলান্টিক বিলীন, ভূমধ্যসাগর নেই |
| তাপমাত্রা | দীর্ঘ সময় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি |
| পরিবেশ | শুষ্ক ও খরাপ্রবণ |
| প্রাণিকুল | স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিলুপ্তির ঝুঁকি |
| বাসযোগ্য অঞ্চল | উপকূলীয় ও উচ্চ অক্ষাংশে সীমিত |
বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ফার্নসওয়ার্থের মতে, এই পরিস্থিতিতে মানুষের মতো প্রাণীদের শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়বে। ঘামের মাধ্যমে শরীর ঠান্ডা রাখার ক্ষমতা কাজ করবে না, এমনকি ছায়ায় অবস্থান করলেও তাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। ফলে বড় আকারের অধিকাংশ প্রাণীর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
এছাড়া, সুপারকন্টিনেন্ট গঠনের সময় ব্যাপক আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি হবে, যা বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করবে। এর ফলে গ্রিনহাউস প্রভাব আরও তীব্র হয়ে উঠবে। একই সময়ে সূর্যের উজ্জ্বলতা প্রায় ২.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে।
তবে গবেষকেরা এটিও স্বীকার করেছেন যে, এত দীর্ঘ সময়ের পূর্বাভাস সম্পূর্ণ নির্ভুল হওয়া কঠিন। টেকটোনিক প্লেটের সামান্য পরিবর্তনও ভবিষ্যতের মানচিত্র ও জলবায়ুর চিত্র বদলে দিতে পারে। তবুও এই গবেষণা ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা মানবজাতিকে বর্তমানেই পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানায়।
