পাপেট শো ও শিশুদের কলরবে মুখরিত বইমেলার শিশুপ্রহর

অমর একুশে বইমেলার প্রতিটি দিনই পাঠকদের পদচারণায় মুখর থাকে, তবে শুক্রবারের সকালটি বরাবরের মতোই একটু ভিন্ন। এদিন মেলা প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে শিশুদের অবারিত আনন্দের ক্ষেত্র। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলা উদ্বোধন করার পর আজ শুক্রবার ছিল ২০২৬ সালের বইমেলার প্রথম শিশুপ্রহর। রোদের তেজ আর পবিত্র রমজানের আমেজ থাকলেও রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশুদের উচ্ছ্বাসে কোনো কমতি ছিল না। রঙিন মলাট, ছবি আঁকার খাতা আর জাদুকরী পাপেট শোর আকর্ষণে মেলা প্রাঙ্গণ রূপ নিয়েছিল এক টুকরো শৈশবের স্বর্গে।

অরিত্রর বায়না ও অমল হাওলাদারের তৃপ্তি

মেলা প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ছয় বছরের শিশু অরিত্রর চঞ্চলতা। ছোটদের একটি বইয়ের স্টলে গিয়ে সে একের পর এক বই উল্টে দেখছে আর তার দাদা অমল হাওলাদারকে বলছে, “দাদা, এই বইটা কিনে দাও। আজকে আমি সুপারম্যান শিখব।” নাতির এমন উচ্ছ্বাস দেখে অমল হাওলাদার মুচকি হেসে বলেন, “নাতি এবারই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ওর মেলায় আসা প্রথমবার। চারপাশের রঙিন পরিবেশ দেখে ওর বায়না আর ফুরোচ্ছে না।” অরিত্রর মতো শত শত শিশুর কলকাকলিতে মেলার প্রাঙ্গণ যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।

পুতুলনাচের জাদুকরী মায়া ও শিশু মনস্তত্ত্ব

এবারের শিশুপ্রহরের প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটার’-এর বিশেষ পাপেট শো বা পুতুলনাচ। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জাহরিয়া মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল কখন পর্দা উঠবে। মঞ্চের পেছন থেকে যখন ডাক এল, “বন্ধুরা, তোমরা সবাই কেমন আছো?” তখন শিশুদের উল্লাস ছিল বাঁধভাঙা। মঞ্চে উপস্থিত হয় দুই বন্ধু ‘অপু’ ও ‘দিপু’। তাদের বুদ্ধিদীপ্ত কথোপকথন আর গল্পের ছলে শিক্ষণীয় বার্তা শিশুদের যেমন আনন্দ দিয়েছে, তেমনি নতুন কিছু শিখতে সাহায্য করেছে।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্ত ছিল বাঘ পুতুলের আগমন। ‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে’ গানের তালে তালে বাঘের নৃত্য দেখে শিশুরা একসঙ্গে হাততালি দিয়ে ওঠে। বাঘটি মঞ্চ থেকে নিচে নেমে এলে শিশুরা তাকে ছুঁয়ে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। বাবার কোলে বসে ছোট্ট তাসনিম আনন্দে আত্মহারা হয়ে জিজ্ঞেস করছিল, “বাবা, বাঘটা কি আবার আসবে?” আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি শিশুপ্রহরেই এমন ভিন্ন ভিন্ন গল্পের আয়োজন থাকবে।

এক নজরে বইমেলার সময়সূচি ও শিশুপ্রহর

পবিত্র রমজান মাসের কারণে এ বছর মেলার সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাঠকদের সুবিধার্থে নিচে একটি তথ্যসারণী দেওয়া হলো:

বিষয়ের নামসময়সূচি ও বিবরণ
সাধারণ দিনপ্রতিদিন বেলা ২:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত।
ছুটির দিন (শুক্র ও শনি)বেলা ১১:০০ টা থেকে রাত ৯:০০ টা পর্যন্ত।
শিশুপ্রহরশুক্র ও শনিবার বেলা ১১:০০ টা থেকে দুপুর ১:০০ টা পর্যন্ত।
সর্বশেষ প্রবেশের সময়প্রতিদিন রাত ৮:৩০ মিনিট পর্যন্ত।
পাপেট শো সময়শিশুপ্রহর চলাকালীন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী।

আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের ভাবনা

কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক জানান, শিশুরা গল্পের মাধ্যমে শিখতে পছন্দ করে। তারা আনন্দের আবহে শিশুদের মনে কুসংস্কার দূর করার এবং নীতি নৈতিকতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পাপেট শো কেবল বিনোদন নয়, এটি শিশুদের সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুপ্রহর ঘিরে মেলার স্টলগুলোতেও ছিল উৎসবের সাজ। বিজ্ঞান বক্স, ভূতের গল্প, কমিকস এবং ছবি আঁকার খাতা বিক্রি হয়েছে দেদারসে। অভিভাবকদের মতে, যান্ত্রিক শহরের চার দেয়ালে বন্দি শিশুদের জন্য বইমেলার এই শিশুপ্রহর এক টুকরো খোলা আকাশ ও নির্মল আনন্দের উৎস। মেলা প্রাঙ্গণে শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির যুগেও বইয়ের প্রতি শৈশবের আকর্ষণ এখনো অটুট রয়েছে।