অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির এক অভিনব ও কঠোর কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। বিশেষ করে জামিনে মুক্তি পাওয়া অপরাধীদের পুনরায় অপরাধে জড়ানো ঠেকাতে তিনি এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন এবং নিয়মিত হাজিরা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি এবং থানা পরিদর্শনের সময় তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
Table of Contents
অপরাধীদের ওপর নজরদারি ও থানা হাজিরা
আইজিপি আলী হোসেন ফকির জানান, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কিশোর গ্যাং, মাদক কারবারি, ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজরা গ্রেফতার হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই জামিনে বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় একই ধরনের অপরাধে লিপ্ত হয়। এই প্রবণতা বন্ধ করতে তিনি প্রতিটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন থেকে জামিনপ্রাপ্ত অপরাধীদের একটি নির্দিষ্ট তালিকা থাকবে এবং তারা প্রতি সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট থানায় এসে ওসির কাছে হাজিরা দিয়ে তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত করবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
আইজিপির পরিদর্শনের মূল বিষয়সমূহ
দায়িত্ব গ্রহণের পরদিনই আইজিপি মাঠ পর্যায়ে পুলিশের সক্রিয়তা বাড়াতে মোহাম্মদপুরের জেনিভা ক্যাম্প, টাউন হল এবং তিন রাস্তার মোড় পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় উঠে আসা প্রধান বিষয়গুলো নিচে টেবিল আকারে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের নাম | আইজিপির নির্দেশনা ও মন্তব্য |
| অপরাধ দমন | অপরাধী যে-ই হোক না কেন, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আইন প্রয়োগে কঠোরতা বজায় থাকবে। |
| মাদক নির্মূল | মাদক নির্মূল করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান। |
| ফুটপাত দখলমুক্ত করা | ফুটপাতে চাঁদাবাজি বন্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে ‘হলিডে মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনা। |
| পোশাক পরিবর্তন | পুলিশের দৃশ্যমান ও কার্যকর পোশাকের প্রয়োজনীয়তা এবং সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক। |
| আচরণগত পরিবর্তন | কেবল পোশাক নয়, পুলিশ সদস্যদের হৃদয়ে সেবার মানসিকতা ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে। |
ফুটপাত ও চাঁদাবাজি বন্ধে পদক্ষেপ
রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানোর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী এবং প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির যোগসাজশ থাকে বলে আইজিপি অকপটে স্বীকার করেন। তিনি জানান, যৌথ চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে শহর পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব নয়। এজন্য প্রথমে মোটিভেশনাল কার্যক্রমের মাধ্যমে হকারদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে। পরবর্তীতে সিটি কর্পোরেশনসহ অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে বিভিন্ন এলাকায় ‘হলিডে মার্কেট’ চালু করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে।
সামাজিক সচেতনতা ও পুলিশি সংস্কার
মাদক নির্মূলে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আইজিপি বলেন, সন্তানরা কার সাথে মিশছে বা কোথায় যাচ্ছে, তা খেয়াল রাখা পরিবারের দায়িত্ব। পুলিশের পোশাক পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা একটি ‘ভিজিবল’ বা সহজেই চেনা যায় এমন পোশাক চাচ্ছেন। তবে তিনি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেন যে, যতোই আধুনিক পোশাক দেওয়া হোক না কেন, যদি পুলিশ সদস্যদের মানসিকতা জনগণের সেবকের মতো না হয়, তবে কোনো সংস্কারই কাজে আসবে না।
পরিদর্শনকালে আইজিপির সাথে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার সরওয়ার এবং তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজানসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশ সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের আরও সক্রিয় করে তোলা।
