দীর্ঘ আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়ে দিল্লির বহুল আলোচিত আবগারি নীতি বা ‘মদ নীতি’ দুর্নীতি মামলা থেকে সসম্মানে খালাস পেয়েছেন আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান ও দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং প্রাক্তন উপ-মুখ্যমন্ত্রী মনীষ সিসোদিয়া। শুক্রবার দিল্লির একটি বিশেষ আদালত এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে। রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বিতর্কিত এই আবগারি নীতি প্রণয়নের পেছনে কোনো সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র বা অপরাধমূলক উদ্দেশ্য ছিল না।
Table of Contents
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সিবিআইয়ের সমালোচনা
মামলার রায়দানকালে বিশেষ আদালতের বিচারক জিতেন্দ্র সিংহ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই-এর তদন্ত প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করেন। আদালত জানায়, সিবিআই এই মামলায় কেজরিওয়ালকে মূল চক্রান্তকারী হিসেবে দাবি করলেও তার সপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিচারকের মতে, “গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে জোরালো তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন; অন্যথায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।”
আদালত আরও উল্লেখ করেছে যে, সিবিআই যেভাবে কিছু সন্দেহভাজনকে ক্ষমা করে দিয়ে পরবর্তীতে ‘রাজসাক্ষী’ বানিয়ে মামলা সাজিয়েছে, তা ত্রুটিপূর্ণ ছিল। এমনকি মামলার ১ নম্বর অভিযুক্ত কুলদীপ সিংয়ের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট সিবিআই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবগারি নীতির প্রেক্ষাপট ও অভিযোগের সারসংক্ষেপ
২০২১-২২ সালে দিল্লি সরকার একটি নতুন আবগারি নীতি প্রবর্তন করেছিল। সরকারি মদের দোকান বন্ধ করে বেসরকারি খাতে লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য ছিল এই নীতির। তবে এই নীতি কার্যকরের ক্ষেত্রে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তোলে বিজেপি ও তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনা।
মামলার ঘটনাক্রম একনজরে:
| সময়কাল | প্রধান ঘটনাবলী |
| নভেম্বর ২০২১ | দিল্লিতে নতুন আবগারি নীতি কার্যকর করা হয়। |
| জুলাই ২০২২ | লেফটেন্যান্ট গভর্নর ভিকে সাক্সেনা সিবিআই তদন্তের সুপারিশ করেন। |
| আগস্ট ২০২২ | সিবিআই কর্তৃক প্রথম এফআইআর দায়ের এবং নীতি প্রত্যাহার। |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | মণীশ সিসোদিয়াকে গ্রেপ্তার করে কেন্দ্রীয় সংস্থা। |
| মার্চ ২০২৪ | মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে অরবিন্দ কেজরিওয়াল গ্রেপ্তার হন। |
| ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | দিল্লির বিশেষ আদালত কর্তৃক কেজরিওয়াল ও সিসোদিয়ার খালাস। |
আবেগাপ্লুত কেজরিওয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি নিজেকে ‘কট্টর ইমানদার’ বা পরম সৎ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আমরা সবসময় বলেছি সত্যেরই জয় হবে। একজন দায়িত্বরত মুখ্যমন্ত্রীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে জেলে ভরা হয়েছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে। আমাদের গায়ে কাদা ছোড়া হয়েছিল, কিন্তু আজ সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার কারণে গত নির্বাচনে আম আদমি পার্টিকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। কেজরিওয়াল ও সিসোদিয়ার দীর্ঘ কারাবাস দলটির সাংগঠনিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। তবে এই খালাস কেবল তাদের ব্যক্তিগত বিজয় নয়, বরং দিল্লির আসন্ন রাজনীতির সমীকরণে আম আদমি পার্টিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সিবিআই-এর পরবর্তী পদক্ষেপ
নিম্ন আদালতের এই রায়ে বড়সড় ধাক্কা খেলেও দমে যাচ্ছে না সিবিআই। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারা এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুতই দিল্লি হাইকোর্টে আপিল করবে। তাদের দাবি, নিম্ন আদালত তদন্তের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক এড়িয়ে গেছে। ফলে এই আইনি লড়াই এখনই পুরোপুরি শেষ হচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
