প্রেম ও মানসিক অস্থিরতায় তরুণীর লাইভ আত্মহত্যা

রাজশাহী মহানগরীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক লাইভে এসে গলায় ফাঁস দিয়ে এক তরুণীর আত্মহত্যার চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। আজ বুধবার দুপুরে নগরীর লক্ষ্মীপুর ভাটাপাড়া কাদের মণ্ডলের মোড় সংলগ্ন একটি বাড়িতে রেজিনা সরকার পাখি (২১) নামের ওই তরুণী নিজ কক্ষে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনমনে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

আত্মপরিচয় ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

নিহত রেজিনা সরকার পাখির আদি নিবাস নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম ইদ্রিস আলী। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি রাজশাহীতে জনৈক এক ব্যক্তির পালিত কন্যা হিসেবে বসবাস করে আসছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় নবম শ্রেণির পর আর তাঁর পড়াশোনা করা হয়নি। পরবর্তীকালে তিনি ধীরে ধীরে বিষণ্নতা ও একাকীত্বের শিকার হন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রেমের টানাপোড়েন ও বিষাদগ্রস্ততা

পুলিশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রেমঘটিত টানাপোড়েন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভারতের এক যুবকের সঙ্গে পাখির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সম্প্রতি ওই সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যা পাখিকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। পুলিশ আরও জানিয়েছে যে, এই মানসিক অস্থিরতা কাটাতে গিয়ে তিনি মাদকের প্রতিও আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

নিচে আত্মহত্যার আগে পাখির দেওয়া শেষ বার্তাগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দেওয়া হলো:

সময় (ঘটনার আগে)ফেসবুক পোস্টের সারমর্ম
৪ ঘণ্টা আগে“আজকে আমার শেষ দিন… পৃথিবীতে আমার জন্য কোনো সুখ নেই।”
২ ঘণ্টা আগে“বিদায় এই সুন্দর পৃথিবী।”
একদম শেষ মুহূর্তেকথিত প্রেমিকের উদ্দেশে “আই লাভ ইউ” ও “আই মিস ইউ” লেখা চিরকুট।
সবশেষেফেসবুক লাইভ চালু করে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো।

ঘটনার বীভৎসতা ও প্রত্যক্ষদর্শী

আত্মহত্যার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি ফেসবুক লাইভে আসেন। সেখানে তাঁকে অত্যন্ত বিষণ্ণ অবস্থায় ওড়না দিয়ে ফাঁস নিতে দেখা যায়। লাইভ চলাকালীন তাঁর পরিচিত ও পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত ঘরে ঢুকে তাঁকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। ভিডিওর শেষ অংশে দেখা যায়, স্বজনরা সিলিং ফ্যান থেকে ওড়না কেটে তাঁকে নিচে নামাচ্ছেন। তবে ততক্ষণে তাঁর প্রাণবায়ু নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল।

প্রশাসনের বক্তব্য ও আইনগত ব্যবস্থা

ঘটনার খবর পেয়ে রাজপাড়া থানা পুলিশ দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। রাজপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, “প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি প্রেমঘটিত ও মানসিক অস্থিরতাজনিত বলে মনে হচ্ছে। মেয়েটি দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং দূরবর্তী প্রেমের সম্পর্কের ব্যর্থতা থেকে এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।”

পুলিশ মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের (রামেক) মর্গে প্রেরণ করেছে। ওসি আরও জানান যে, এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে এলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা নতুন প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যের ভঙ্গুর অবস্থাকেই নির্দেশ করে। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে তরুণ-তরুণীদের প্রতি আরও যত্নশীল হওয়া এবং মানসিক সংকটে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।