হিমালয়কন্যার চাকরির বাজার ও জীবনসংগ্রাম

দক্ষিণ এশিয়ার পাহাড়ি দেশ নেপাল তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং হিমালয় পর্বতের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। তবে এই “হিমালয়কন্যা” কেবল পর্যটক ও অভিযাত্রীর স্বপ্নের দেশ নয়, এটি হাজার হাজার নেপালির জীবনের সংগ্রাম এবং কর্মসংস্থানের অস্থিরতারও প্রতীক। দেশের অর্থনীতি প্রধানত তিনটি খাতের উপর নির্ভরশীল—পর্যটন, কৃষি, এবং প্রবাসী আয়। কিন্তু চাকরির বাজারে দীর্ঘদিন ধরে দেখা যাচ্ছে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং আয়-বিতরণের বৈষম্য।

নেপালের শ্রমবাজারে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে বৈষম্য স্পষ্ট। সরকারি চাকরি, যেমন নিজামতি সেবা, যুব সমাজের কাছে মর্যাদার প্রতীক। সরকারি চাকরির প্রধান সুবিধা হলো চাকরির স্থায়িত্ব, পেনশন, বিমা, এবং আবাসন সুবিধা। তবে সরকারি পদ সংখ্যা সীমিত, ফলে উচ্চ প্রতিযোগিতা। একজন গেজেটেড অফিসারের মাসিক বেতন প্রায় ৪৫,০০০ থেকে ৬০,০০০ নেপালি রুপি (NPR), যা জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সম্মানজনক হলেও বিলাসী নয়।

বেসরকারি খাতের মূল চালিকা শক্তি হলো পর্যটন, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং এনজিও খাত। কাঠমান্ডু ও পোখরার মতো শহরগুলোতে বেতন তুলনামূলকভাবে ভালো, তবে ছোট ও মাঝারি শিল্পে আয়ের সুযোগ সীমিত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শ্রম আইন মেনে চলার প্রবণতা থাকলেও স্থায়িত্বের অভাব এবং অতিরিক্ত চাপ সাধারণ।

নেপালের শ্রমবাজারের তথ্য

খাতপ্রধান সুবিধাগড় মাসিক বেতন (NPR)চ্যালেঞ্জ
সরকারি চাকরিস্থায়িত্ব, পেনশন, বিমা৪৫,০০০–৬০,০০০সীমিত পদ ও তীব্র প্রতিযোগিতা
বেসরকারি ব্যাংক ও ITউচ্চ বেতন, বোনাস৩০,০০০–৫০,০০০স্থায়িত্ব সীমিত, অতিরিক্ত চাপ
পর্যটন ও এনজিওকাজের সুযোগ২০,০০০–৩৫,০০০কম বেতন, অস্থিরতা

নেপালের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং নেপাল পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৪–৫ লাখ যুবক শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, কিন্তু তাদের বড় অংশ দেশে উপযুক্ত চাকরি পায় না। ফলে নেপালের যুবসমাজ মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপ-আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ছে। দেশের জিডিপির প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ আসে এই প্রবাসী রেমিট্যান্স থেকে।

চাকরিজীবীর জীবনধারণও এখন চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। কাঠমান্ডুর মতো শহরে চার সদস্যের পরিবার মাসে প্রায় ৪০,০০০–৫০,০০০ NPR খরচ করে, অথচ সাধারণ বেসরকারি কর্মীর আয় প্রায় ২০,০০০–৩৫,০০০ NPR। অনেক পরিবার ঋণ নির্ভর বা পরিবারের একাধিক সদস্যকে কাজে নামাতে বাধ্য।

পাহাড়ি অঞ্চলে জীবনযাত্রার ব্যয় কম হলেও আয়ের সুযোগ আরও সীমিত। ফলে শহরমুখী মানুষের চাপ বেড়ে গেছে। উৎসব এবং বোনাসের আনন্দও মুদ্রাস্ফীতির কারণে অনেক সময় কমে যায়। তবুও নেপালিরা সামাজিক বন্ধন এবং সহনশীলতার মাধ্যমে জীবন চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকার জলবিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তবে শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৃণমূল পর্যায়ে না পৌঁছালে বেকারত্বের সমস্যা অটুট থাকবে। হিমালয়ের দেশ নেপালে জীবনসংগ্রাম এবং চাকরির অস্থিরতা এখনও চলমান, কিন্তু পরিশ্রমী মানসিকতা এবং সহনশীলতার কারণে দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে।