খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৭:৮ এএম

দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম ও অতিরিক্ত কমিশন বাণিজ্য বন্ধে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ)। বীমা খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ‘শূন্য কমিশন নীতি’ (Zero Commission Policy) মাঠ পর্যায়ে শতভাগ কার্যকর করতে প্রতিটি বীমা কোম্পানির ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকারনামা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে বীমা খাতের দীর্ঘদিনের অস্বচ্ছতা দূর হবে এবং গ্রাহকের আমানত ও প্রিমিয়ামের অর্থের নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Table of Contents
গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মো. ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত একটি চিঠির মাধ্যমে দেশের সকল নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাদের (CEO) এই নির্দেশনা প্রদান করা হয়। চিঠিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (IDRA) কর্তৃক জারিকৃত সার্কুলারের আলোকে ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে সকল বীমা এজেন্টের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। ফলে বর্তমানে কোনো বীমা কোম্পানিতেই বৈধ এজেন্ট নেই এবং এজেন্টদের কমিশন প্রদানের কোনো আইনি সুযোগও অবশিষ্ট নেই।
এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে এখন থেকে মাঠ পর্যায়ে বীমা ব্যবসা সংগ্রহের জন্য সরাসরি ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এবং কোম্পানির নিজস্ব বেতনভুক্ত জনবল দায়িত্ব পালন করবেন। আর এই প্রক্রিয়ায় যেন কোনো ধরনের গোপন কমিশন লেনদেন না হয়, তা নিশ্চিত করতেই এই অঙ্গীকারনামা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
বিআইএ প্রদত্ত এই অঙ্গীকারনামায় ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শর্তের ওপর স্বাক্ষর করতে হবে। নিচে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রদান করা হলো:
| ক্রমিক | অঙ্গীকারনামার মূল বিষয়সমূহ | বিবরণ ও দায়বদ্ধতা |
| ১ | জিরো কমিশন নীতি | প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোভাবেই কমিশন লেনদেন করা যাবে না। |
| ২ | আইনি আনুগত্য | বীমা আইন ও আইডিআরএ-এর সকল নির্দেশনা যথাযথ পালন। |
| ৩ | আর্থিক স্বচ্ছতা | গ্রাহকের সকল প্রিমিয়াম সরাসরি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা নিশ্চিত করা। |
| ৪ | অনুপযুক্ত সুবিধা | কোনো প্রকার উপঢৌকন বা আর্থিক প্রণোদনা গ্রহণ বা প্রদান নিষিদ্ধ। |
| ৫ | শাস্তিমূলক ব্যবস্থা | বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোম্পানি বা কর্তৃপক্ষের যেকোনো কঠোর দণ্ড মেনে নেওয়া। |
নন-লাইফ বীমা খাতে কমিশন কেন্দ্রিক অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। অনেক কোম্পানি ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নির্ধারিত প্রিমিয়ামের বড় একটি অংশ কমিশন হিসেবে প্রদান করত, যা মূলত গ্রাহকের অধিকার ক্ষুণ্ণ করত। ‘শূন্য কমিশন নীতি’ কার্যকর হওয়ার ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। এতে করে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভিত্তি মজবুত হবে এবং তারা গ্রাহকদের আরও ভালো সেবা ও দ্রুত দাবি পরিশোধে সক্ষম হবে।
ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের এই অঙ্গীকারনামা কেবল একটি কাগুজে দলিল নয়, বরং এটি তাদের পেশাগত সততার একটি সনদ হিসেবে বিবেচিত হবে। বিআইএ জানিয়েছে, এই অঙ্গীকারনামা গ্রহণের পর প্রতিটি কোম্পানিকে তা অ্যাসোসিয়েশনকে অবহিত করতে হবে। যদি কোনো ব্রাঞ্চ ম্যানেজার এই নীতি লঙ্ঘন করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাঁর ক্যারিয়ারের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের বীমা শিল্পকে একটি আন্তর্জাতিক মানের ও স্বচ্ছ খাতে রূপান্তর করতে ‘শূন্য কমিশন নীতি’ একটি মাইলফলক। বিআইএ-এর এই সময়োপযোগী নির্দেশনা ব্রাঞ্চ ম্যানেজারদের মধ্যে দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে এবং প্রকৃত বীমা গ্রাহকরা উপকৃত হবেন। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনা কতটুকু স্বচ্ছতার সাথে বাস্তবায়িত হয়। তবে বিআইএ এবং আইডিআরএ-এর যৌথ তৎপরতা নির্দেশ করছে যে, অনিয়মের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আপস করা হবে না।
মন্তব্য